
ইতিহাস কখনও কখনও তার আদি পরিচিতিকে এমনভাবে আড়াল করে দেয়, যা দেখে নতুন প্রজন্মের পক্ষে তার শিকড় চেনা বেশ দুষ্কর হয়ে পড়ে। হুগলি নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা আজকের দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যতম মহকুমা শহর ডায়মন্ড হারবার যেন তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। আজ যে অঞ্চলকে আমরা নিছকই এক নদী-বন্দর বা সপ্তাহান্তের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে চিনি, তার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে জলদস্যুদের দাপট, লবণের বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক আগ্রাসন।
ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, আজকের ‘ডায়মন্ড হারবার’-এর আদি নাম ছিল চিংড়িখালি। হুগলি নদীর খাঁড়িতে চিংড়ি মাছের প্রাচুর্য অথবা স্থানীয় ‘চোয়াড়’ জনজাতির নামের বিকৃতি— যে কারণেই এই নামকরণ হোক না কেন, তা ছিল মাটির কাছাকাছি। কালের বিবর্তনে এই চিংড়িখালিই একদা রূপান্তরিত হয় ‘হাজীপুর’-এ। মছলন্দ পীরের দরগায় হজযাত্রীদের আনাগোনা এবং প্লেগের প্রকোপে পড়া যাত্রীদের আটকে থাকার রাজসাক্ষী এই হাজীপুর।
কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসকেরা এই অঞ্চলের ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুধাবন করে একে নতুন রূপ দিতে চাইল। নাম রাখা হল ‘ডায়মন্ড হারবার’। কিন্তু এই ‘ডায়মন্ড’ বা হিরের নামকরণের রহস্য কোথায়? কোনও বহুমূল্য রত্ন নয়, বরং এই অঞ্চলের অর্থনীতি সচল রাখা শ্বেতশুভ্র লবণের স্তূপই ছিল এর কারণ। রোদ পড়লে নদীর তীরে স্তূপীকৃত সেই নুন হিরের মতো ঝকমক করে উঠত বলেই সাহেবরা ভালোবেসে এর এমন নামকরণ করেছিলেন। ১৮৫১ সালের কোম্পানির গেজেট প্রমাণ দেয়, ততদিনে এই বন্দর ব্রিটিশ বাণিজ্যের এক অপরিহার্য ধমনী হয়ে উঠেছে।
ডায়মন্ড হারবারের ইতিহাস শুধু বাণিজ্যের নয়, তা আত্মরক্ষারও বটে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের ‘হার্মাদ বাহিনী’ এই অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তাদের প্রতিরোধ করতেই ১৮৬৮-৬৯ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা গড়ে তোলে ‘চিংড়িখালি ফোর্ট’ বা স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হত ‘পুরাতন কেল্লা’। আজ সেই কেল্লার চিহ্ন প্রায় বিলুপ্ত, কিন্তু তা মনে করিয়ে দেয় এক অশান্ত, রক্তক্ষয়ী যুগের কথা।
একবিংশ শতকের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ১৮৫১ সালে কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্তই পাতা হয়েছিল ভারতের প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন। অর্থাৎ, এ দেশের আধুনিক যোগাযোগের প্রথম পরীক্ষাগার ছিল এই মাটিই। ১৮৫৭ সালে মহকুমা সদরের স্বীকৃতি লাভ, ১৮৬৪ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্বল্পকালীন অবস্থান, কিংবা ১৮৮৩ সালে বারুইপুর পর্যন্ত রেল সম্প্রসারণ— ডায়মন্ড হারবারকে ক্রমশ আধুনিক করে তুলেছিল। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহে আইনজীবী চারুচন্দ্র ভান্ডারীর নেতৃত্বে এই অঞ্চলের মানুষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনেও শামিল হয়েছিল, যার প্রতীক হিসেবে ‘খাদিমন্দির’ আজও কোনওমতে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
তবে ডায়মন্ড হারবারের প্রাচীনত্বকে কেবল মুঘল বা ব্রিটিশ আমলের ফ্রেমে বেঁধে রাখলে চলবে না। টলেমির রচনায় উল্লেখিত ‘পালৌরা’ বা ‘পালুরা’ বন্দরের সম্ভাব্য অবস্থান ছিল এই অঞ্চলেরই আব্দালপুর বা পারুল গ্রামে। এই অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া গুপ্তযুগের প্রত্নসামগ্রী, প্রস্তরায়ুধ, পোড়ামাটির মূর্তি এবং দেউলপোতার প্রাচীন দেউলের ধ্বংসাবশেষ প্রমাণ করে, আজ থেকে দেড়-দুই হাজার বছর আগেও এই নদীর তীর এক সমৃদ্ধ সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ডায়মন্ড হারবার আজ হয়তো তার কেল্লা হারিয়েছে, হারিয়েছে লবণের সেই হিরের মতো ঔজ্জ্বল্যও। তবুও এই ডায়মণ্ড হারবারে পা দিলে, আজও যেন ইতিহাস কথা বলে ওঠে।