
১৯৪৪ সালের অগস্টে একজন ফোনে আরেকজনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইজ প্যারিস বার্নিং? না, প্যারিস সেদিন পোড়েনি। প্রশ্নকর্তার আশা পূরণ হয়নি। আজ আশি বছর পর পুড়ছে। গোটা ফ্রান্সই পুড়ছে। শুধু ফ্রান্স কেন, গোটা ইউরোপই আগুনে পুড়ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে হিটলার বুঝতে পেরেছিলেন, ফ্রান্স আর তিনি ধরে রাখতে পারবেন না। তাই সেনাকর্তা জেনারেল ভন কোলটিজ-কে নির্দেশ দেন প্যারিস পুড়িয়ে দিন। আইফেল টাওয়ার, ল্যুভ মিউজিয়াম, নোত্র দাম – কিছু বাদ রাখবেন না। হিটলারের নির্দেশ কোলটিজ মানেননি। ছবি, কবিতা, সুরা আর প্রেমের শহর প্যারিস পোড়াতে তাঁর মন সায় দেয়নি। ১৯৪৪ সালের ২৫ অগস্ট অধৈর্য হয়ে হিটলার ফোনে কোলটিজ-কে জিজ্ঞাসা করেন, ইজ প্যারিস বার্নিং? ফোনের ওপাশ থেকে কোনও উত্তর আসেনি। ওইদিনই কোলটিজ মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইজ প্যারিস বার্নিং, এই তিনটে শব্দ হিটলারের নিষ্ঠুরতার প্রতীক হয়ে ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে। সেদিন না পুড়লেও আজ প্যারিস পুড়ছে। জ্বলছে সব। প্যারিজ ইজ বার্নিং। ফ্রান্স ইজ বার্নিং। ইউরোপ ইজ বার্নিং। এই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে অস্ট্রিয়া আর গ্রিস।
মোজার্টের দেশের মানুষ বলছেন, জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে ২৫ শতাংশ। জিনিসের দাম বেড়ে গিয়েছে পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ। জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে সুর। অস্ট্রিয়ার তরুণ প্রজন্ম ভিয়েনার রাস্তায় নেমেছে। তারা বলছে, উচ্চশিক্ষায় গবেষণার টাকা ছেঁটে দিয়েছে সরকার। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অশিক্ষক কর্মীদের ক্যাজুয়াল করে দেওয়া হচ্ছে। এডুকেশন সিস্টেমটাই লাটে উঠে গিয়েছে। অ্যাথেন্সের পথে-ঘাটেও অনেকটা একইরকম অভিযোগ। পড়ুয়ারা বলছে যে সরকার হস্টেলের ব্যবস্থা করছে না। বাড়িভাড়া এত বেশি যে ভাড়া নিয়ে কোথাও থাকাও সম্ভব নয়। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়।
ইউরোপের দেশে দেশে একই ছবি। বিক্ষোভের আগুনে জ্বলছে মহাদেশ। যেখানে লিবারালরা ক্ষমতায়, সেখানে তারা বলছে এসব করছে অতি-বামপন্থীরা। ফার রাইটরা তখন আগুনে রুটি সেঁকছে। তারা মানুষকে বোঝাচ্ছে, আমাদের ক্ষমতায় আনো। এসব আন্দোলন একদিনে সিধে করে দেব। স্পেনে আবার বামপন্থী সরকার। সেখানে মানুষ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিংয়ের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। ডানপন্থীরা বলছে, সমস্যা বুঝুন। অভিবাসীরাই তো আপনাদের থাকার জায়গা কেড়ে নিচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রবল অশান্তি, ডামাডোল আর স্বার্থের সংঘাতে ইউরোপ এখন দিশাহীন।
ভারতকে আবার এই মুহূর্তে দুটো দেশকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হচ্ছে। ফ্রান্স ও ইতালিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের নিয়ে চিন্তায় দিল্লি। প্রবাসী, অনাবাসী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মিলিয়ে ইতালিতে সংখ্যাটা প্রায় আড়াই লাখ। ফ্রান্সেও কমবেশি এক লাখ কুড়ি হাজার। প্যারিস আর রোমের ভারতীয় দূতাবাস এঁদের সবাইকেই জমায়েত এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছে। অশান্ত ফ্রান্স-ইতালিতে যে কোনও দরকারে যোগাযোগের জন্য দেওয়া হয়েছে ইন্ডিয়ান অ্যামবাসি ও কনস্যুলেটের ফোন নম্বর। ভারত থেকে যাঁরা এই দুই দেশে বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করেছেন, তাঁদের জন্যও বিদেশমন্ত্রকের একইরকম পরামর্শ, গন্ডগোলের জায়গায় ভুলেও যাবেন না। তবে, শুধু ফ্রান্স বা ইতালি নয়, অশান্তির গোটা ইউরোপেই এবার শরত্ এসেছে গ্রীষ্মের চেয়েও বেশি উত্তাপ নিয়ে।