
ওয়াশিংটন: ‘পরের দ্রব্যে হাত দিও না। না বলিয়া পরের দ্রব্য লইলে চুরি করা হয়। চুরি করা বড় দোষ।’ বর্ণপরিচয়ের দ্বিতীয় ভাগে লিখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এমন নীতিশিক্ষার ব্যবস্থা দেশের অন্যান্য রাজ্যেও আছে। সারা দুনিয়াতেই আছে। তারপরও চুরি হয়। এই গ্রহের সর্বত্র চুরি হয়। তবে, একটা দেশ যখন চুরি করে, তা নিয়ে শোরগোল পড়ে। তেমনই একটি চুরি নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।
ভারত পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কিনতে চলেছে। দৌড়ে রয়েছে, আমেরিকার এফ-৩৫ আর রাশিয়ার সুখোই-৫৭। সুখোইয়ের পাল্লা ভারী। আর বাজারে আছে চিনের জে-২০। এই তিনটেই আপাতত সারা দুনিয়ায় প্রথম সারির পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বলে স্বীকৃত। রেডারে যাতে ধরা না পড়ে সেজন্য স্টেলথ প্রযুক্তি। বোমা আর মিসাইল বিমানের বাইরের দিক থেকে ঝুলে থাকবে না, ভিতরে নির্দিষ্ট চেম্বারে থাকবে। কম্পিউটার নিজে থেকে বিমানের যাবতীয় ডেটা অ্যানালিসিস করে পাইলটের হেলমেট স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলবে, পাইলটকে নিজে থেকে কিছু ক্যালকুলেশন করতে হবে না। আর গতি থাকতে হবে শব্দের চেয়ে বেশি। এই চারটে শর্ত পূরণ করতে পারলে তবে কোনও বিমানকে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বলা হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল স্টেলথ প্রযুক্তি। রেডার, ইনফ্রারেড ও অন্যান্য সেন্সরের চোখে ধুলো দিয়ে শত্রু সীমানায় ঢুকে পড়ার ক্ষমতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র এই ক্রাইটেরিয়া ধরলে এফ-৩৫ বেস্ট। এখনও পর্যন্ত প্রায় তেরোশো এফ-৩৫ তৈরি করেছে লকহিড মার্টিন। ৮০০ আছে মার্কিন বায়ুসেনার কাছে। বাকি ৫০০ প্রায় ২০টা দেশ ব্যবহার করে। যেমন অস্ট্রেলিয়ার বায়ুসেনায় আছে প্রায় সত্তরটা বিমান। সম্প্রতি, এগুলোর নানা যন্ত্রাংশে কিছু মেরামতির দরকার পড়ে। সেটা অস্ট্রেলিয়ায় সম্ভব নয়। তাই কার্গো বিমানে এইসব যন্ত্রাংশ আমেরিকার টেক্সাসে লকহিড মার্টিনের প্ল্যান্টে পাঠানো হচ্ছিল।
এখান থেকেই আসল খবরটা বের করেছে মার্কিন সংবাদপত্র পলিটিকো। কার্গো বিমানটির দক্ষিণ কোরিয়া হয়ে আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনও অজানা কারণে সেটি গিয়ে নামে হংকংয়ে। আর পরে দেখা যায় যে ওই বিমান থেকে এফ-৩৫-এর বেশকিছু যন্ত্রাংশ উধাও। যার মধ্যে রয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ককপিট ক্যানোপি। বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরি এফ-৩৫-এর এই ককপিটের ঢাকনার ওপর লাগানো থাকে ইন্ডিয়াম টিন অক্সাইড নামে একটা যৌগের প্রলেপ। যা রেডার তরঙ্গকে প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয়। তরঙ্গ ককপিটের ভিতরে ঢুকতে পারে না। ফলে, বিমানটিকেও রেডার সনাক্ত করতে পারে না।
এখন জায়গাটা হল হংকং। যা নামে স্বায়ত্ত্বশাসিত হলেও পুরোপুরি চিনের দখলে। ফলে, পেন্টাগনের কর্তারা পড়েছেন চিন্তায়। চিনা গবেষকরা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাস্টার। আমেরিকার তাই আশঙ্কা, ককপিট ক্যানোপি-সহ যাবতীয় যন্ত্রাংশ হংকং থেকে চলে যাবে মেনল্যান্ড চায়নায়। তারপর চুরি হয়ে যাবে বিমানের এই স্টেলথ প্রযুক্তি। পলিটিকোর খবরের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের মাথারা। তবে, প্রকাশ্যে তাঁরা কেউ কিছু জানাননি। লজিস্টিকসের ভুল বলে চুপ অস্ট্রেলিয়া। আর লকহিড মার্টিন বলে দিয়েছে চুরির ঘটনাতে তাদের কোনও দায় নেই। কার্গো বিমান তারা অপারেট করছিল না। চুরি যাওয়া যন্ত্রাংশ উদ্ধার, কেন প্লেন হংকংয়ে নামল, এইসব নিয়ে পেন্টাগন তদন্ত চালাচ্ছে বলে শেষ খবর পাওয়া গিয়েছে।
বিমান চুরি ব্যাপারটা আগেও হয়েছে, নতুন নয়। আর দুটো ঘটনাতেই জড়িত ছিল মোসাদ। ১৯৬৬ সালে এক ইরাকি পাইলটকে হাত করে তারা ইরাক থেকে একটা রাশিয়া মেড মিগ-২১ বিমান তেল আভিভে নিয়ে আসে। তারপর সেই বিমানটির প্রযুক্তিগত রহস্য খতিয়ে দেখার জন্য পাঠিয়ে দেয় আমেরিকায়। ১৯৬৯ সালে ফের মোসাদের এজেন্টরা ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশনের কারখানা থেকে মিরাজের নকশা ও প্রযুক্তি চুরি করে। বলা হয় যে তা দিয়ে ইজরায়েল নেশের ও ফফির নামে নিজেদের দুটো বিমান বানিয়ে নেয়। আর এবার তো খেলায় নেমেছে চিন। ফলে চিন্তা বেড়েছে আমেরিকার।