
১৩ নভেম্বর, ১৯৭৪। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ইয়াসের আরাফতের ঐতিহাসিক ভাষণ। পিএলও নেতা সেদিন নিউইয়র্কের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্যালেস্তাইনের স্টেটহুডের জন্য জোরালো সওয়াল করেন। আরাফতের সে ভাষণের শেষ লাইনগুলো ছিল, ‘টুডে আই হ্যাভ কাম বিয়ারিং অ্যান অলিভ ব্র্যাঞ্চ অ্যান্ড এ ফ্রিডম-ফাইটার্স গান। ডু নট লেট দ্য অলিভ ব্র্যাঞ্চ ফল ফ্রম মাই হ্যান্ড। আই রিপিট, ডু নট লেট দ্য অলিভ ব্র্যাঞ্চ ফল ফ্রম মাই হ্যান্ড।’ যার অর্থ, “আমার হাত থেকে যেন জলপাই গাছের পাতাগুলো খসে পড়তে দেবেন না।”
অলিভ ট্রি ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের স্বাভাবিক উদ্ভিদ। যীশুর জন্মস্থান বেথলেহেমে আছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন অলিভ গাছ। বয়স মনে করা হয় ৫ হাজার বছর। প্রাচীন গ্রিসে অলিম্পিক পদক ছিল অলিভ গাছের পাতায় তৈরি মুকুট। জলপাই গাছ শান্তির প্রতীক। বিশেষ করে প্যালেস্তাইনে তো বটেই। ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের মানুষের বড় অংশের রুটি রুজি আসে জলপাই চাষ করে। আর তাই ইয়াসের আরাফতের গলায় সেদিন শোনা গিয়েছিল, “আমাদের যুদ্ধের পথে ঠেলে দেবেন না। শান্তির পথেই প্যালেস্তাইন তৈরি হোক। আমার হাত থেকে জলপাই গাছের পাতাগুলোকে খসে পড়তে দেবেন না।”
হঠাৎ কেন এই প্রসঙ্গ উঠছে? কারণ, অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে প্যালেস্তিনীয় অলিভ চাষিদের ওপর গুলি চালাচ্ছে ইজরায়েলি সেনা। কেটে সাফ করে দিচ্ছে অলিভের জঙ্গল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর কাঁটাতার পেরিয়ে গাজা থেকে ইজরায়েলে ঢুকে হামলা চালিয়েছিল হামাস জঙ্গিরা। প্রায় বারোশো জনকে হত্যা করে তারা। আড়াইশো জনকে পণবন্দি করা হয়। বদলা নিতে দশ লক্ষ মানুষের বাসভূমি গাজাকে ধুলো করে দিয়েছে ইজরায়েলি সেনা। আর এখন ওয়েস্ট ব্যাঙ্কেও শুরু হয়েছে তাণ্ডব।
গত পঞ্চাশ বছরে অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক ও পূর্ব জেরুসালেমে প্রায় দেড়শো ইহুদি বসতি তৈরি করেছে ইজরায়েল। সেখানে জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে পৌঁছে গেছে পাঁচ লাখে। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্যালেস্তাইনের জমিতে নতুন করে আরও একশো ইহুদি সেটলমেন্টের অনুমতি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ তুলে অকুপায়েড ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে বাড়িঘর সব ভেঙে দিচ্ছে ইজরায়েলি বুলডোজার। আর এর সঙ্গেই সামনে আসছে অলিভ চাষিদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ।
অক্টোবর থেকে সারা উত্তর গোলার্ধে শুরু হয় গাছ থেকে অলিভ ফল তোলার মরসুম। আর ঠিক তখনই ইজরায়েল প্যালেস্তিনীয়দের নতুন করে ভাতে মারার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়। উন্নয়নের জন্য গাছ কাটা তো রয়েইছে। এইবার যুদ্ধের জন্য গাছ কাটা চলছে। প্যালেস্তাইনের রাজধানী ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের রামাল্লার কাছে আল-মুঘাহির নামে একটা গ্রাম রয়েছে। ৪ হাজার মানুষের বাস। গ্রাম ঘেরা ছিল জলপাইয়ের বনে। বাসিন্দারা সবাই প্যালেস্তাইনি সেটলার। আচমকা ইজরায়েলি সেনা গ্রামের দখল নেয়। বাসিন্দাদের ঘরছাড়া করে। তারপর ওরা তিন হাজার অলিভ গাছ, তিন দিনে কেটে সাফ করে দেয়। যুক্তি হল, ওই এলাকায় যেসব ইহুদি সেটলার রয়েছেন, তাঁদের নাকি গাছগুলোর জন্য যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছিল। তবে, আসল কারণটা হল, ওই অঞ্চলে নতুন করে ইহুদি বসতি তৈরি করতে চায় ইজরায়েল।
অলিভ গাছগুলোকে কেটে ফেলার কারণ সেখানে যেন আর প্যালেস্তিনীয়রা ফিরে আসতে না পারেন। গাছগুলোকে কেটে ফেলে তাঁদের চরম মানসিক আঘাত দিতে চেয়েছে ইজরায়েলি সেনা। অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে প্রায় সর্বত্র এই জিনিস চলছে।
প্যালেস্তাইনের মানুষের কাছে অলিভ গাছের একটা আলাদা সেন্টিমেন্ট রয়েছে। আর জলপাইয়ের বন কেটে ফেলে আর্মির যাতায়াতের পথ তৈরি করার ব্যাপারটা তো আছেই। সম্প্রতি জেরুজালেমের পূর্ব দিকে ১২ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৩ হাজার মানুষের ইহুদি বসতি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইজরায়েল। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলছেন, তৈরি হবে গ্রেটার জেরুজালেম। মুছে দেব প্যালেস্তাইনের ধারণা। জন্মলগ্ন থেকেই এই কাজটা করে আসছে ইজরায়েল। প্যালেস্তাইনের এলাকায় নিজের লোক ঢুকিয়ে দেওয়া। তারপর ইহুদি জনসংখ্যা বাড়লে বলে যে ওটা তার এলাকা। কারণ তার এথনিসিটির লোকেরাই ওখানে বেশি থাকে।
ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন টু স্টেট সলিউশন আর মানতে রাজি নয় ইজরায়েল। টু স্টেট সলিউশনে বলা হয়েছিল, ইজরায়েলের এখনকার ভূখণ্ড ও পশ্চিম জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়াল সংলগ্ন এলাকা নিয়ে তৈরি হবে ইজরায়েল। আর গাজা স্ট্রিপ, জর্ডন নদীর পশ্চিম পাড়ে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক ও পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদ, টেম্পল মাউন্টেন নিয়ে তৈরি হবে প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র। সেসব ঝেড়ে ফেলে ইজরায়েল এখন ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে সর্বত্র ইহুদি সেটলারদের ঢুকিয়ে দিতে মরিয়া। আর তাই কাটা যাচ্ছে জলপাই গাছের বন। গাছের গায়ে নয়। আসলে সভ্যতার ঘাড়ে নেমে আসছে কুড়ুল। সেটাও আবার ইতিহাসের আঁতুড়ঘরে।