
জাপান: রুটিন মেনে প্রতি মাসে ২ বার করে সমুদ্রে ডুব দেন ইয়াসুও তাকামাতসু। সমুদ্রের ৫০ মিটার গভীরে ডুব দেন। সমুদ্রের অতলে চোখ মেলে দেখেন সব। যদি দেখা হয়। হয়ত সে একদিন বলে উঠবে, ‘তোমার কত বয়স হয়ে গিয়েছে…’! ১৩ বছর ধরে এই আশাতেই প্রতি মাসে ডুব দেন ইয়াসুও। কারণ সমুদ্রের নীচে ঘুমিয়ে আছেন স্ত্রী ইউকো।
জাপানের উত্তর-পূর্ব মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। মুখে থাকে মাস্ক, শরীরে এয়ার ট্যাঙ্ক এবং ওয়েট বেল্ট পরা। নৌকাটি অনেকটা দূরে চলে গেলে নীচের ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দেন তিনি। ফিরে যান সেই সাগরে, যে সাগর তাঁর স্ত্রী ইউকোকে কেড়ে নিয়েছিল।
২০১১ সালে জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে আঘাত হানে সুনামি। একটি ব্যাঙ্কের ছাদে ছিলেন ইউকো। বিশাল ঢেউয়ে সেখান থেকেই ভেসে যান তিনি। উপকূল থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছিল সেই ঢেউ।
ঘটনার দিন সকালেও ইয়াসু কর্মস্থলে পৌঁছে দিয়েছিলেন ইউকোকে। রাতের খাবার নিয়ে সেদিন কথাও হয়েছিল তাঁদের মধ্যে। যখন সুনামির সাইরেন বেজে উঠল, তখন ইউকো তাঁর ১২ জন সহকর্মীর সঙ্গে অফিসের ছাদে উঠে যান। সেখান থেকে স্বামীকে একটি মেসেজ পাঠান, “তুমি কি নিরাপদে আছ? আমি বাড়ি যেতে চাই।” মেসেজটা দেখে ইয়াসু ভেবেছিলেন তাঁর স্ত্রী নিরাপদেই আছেন। কিন্তু পরেরদিন, বেঁচে যাওয়া মানুষজন যেখানে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই হাসপাতালে গিয়ে তিনি দেখেন তাঁর স্ত্রী সেখানে নেই।
জল নেমে যাওয়ার পর যখন হাজার হাজার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়, তখনও ইউকোর মতো অনেকেই নিখোঁজই থেকে যান। দু বছর ধরে ইয়াসুও ডুবুরিদের তুলে আনা মৃতদেহ আর জিনিসপত্র দেখতে থাকেন।
তারপর শুরু হয় তাঁর এই নতুন রুটিন। তাঁর কথায়, “আমি ডুব দেওয়া চালিয়ে যাব, একদিন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে”।
৭৬০টিরও বেশি ডাইভ দিয়ে ফেলেছেন তিনি। তাঁর অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে ইয়াসুও বলেন, “বারবার ডুব দেওয়ার পর আমার মনে হতে লাগল যে সে হয়ত আশেপাশেই আছে। এটা কবরে গিয়ে স্মরণ করার চেয়ে একটু আলাদা, কারণ সে কবরে নেই। বরং মনে হয় যেন আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। আমার মনে হয়, দেখা হলে সে হয়ত অবাক হয়ে আমাকে প্রথমে বলত, ‘তোমার বয়স হয়ে গিয়েছে’।”
তবে ইয়াসুও সমুদ্রকে ঘৃণা করেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেনে নিয়েছেন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনিবার্য এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।