
উনিশশো উনচল্লিশ সাল। জোসেফ স্তালিন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করেন। রাশিয়ার ১০ লক্ষ সেনা। ফিনল্যান্ডের ৪ লক্ষ। রাশিয়ার হাতে শক্তিশালী ট্যাঙ্ক। যুদ্ধবিমান। আধুনিক সব যুদ্ধাস্ত্র। সেই তুলনায় ফিনিশ আর্মির শক্তি বলতে কিছুই নেই। স্তালিন ভেবেছিলেন এক সপ্তাহে ফিনল্যান্ড দখল করা হয়ে যাবে। রাশিয়া-ফিনল্যান্ড সীমান্তে ফিনল্যান্ডের সুয়োমাসলমি শহরে যুদ্ধ চলে এক মাস। ফিনিশদের প্রবল প্রতিরোধের সামনে সেদিন ল্যাজ গুটিয়ে পালায় স্তালিনের সেনা।
কেন পালাতে হয়েছিল স্তালিনের সেনাকে?
ওই এলাকাটা ছিল ঘন জঙ্গলে ভরা। গ্রামীণ ফিনল্যান্ডে রাস্তাঘাট ছিল সরু আর খুব খারাপ। ফলে রাশিয়ান ট্যাঙ্কগুলো পাশাপাশি এগোতে পারেনি। তারা সিঙ্গল ফাইলে একটার পিছনে একটা এভাবে এগোতে বাধ্য হয়। ফিনল্যান্ড করল কী, লাইন ধরে এগোতে থাকা রুশ ট্যাঙ্কগুলোর মধ্যে প্রথম আর শেষটাকে একসঙ্গে ধ্বংস করা শুরু করল। তাতে মাঝের ট্যাঙ্কগুলো আটকে গেল। এইবার আকাশ থেকে বোমা ফেলে ফিনিশ বায়ুসেনার পাইলটরা আটকে পড়া রুশ ট্যাঙ্কগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন। এটাই ছিল ফিনিশদের যুদ্ধজয়ের মেন রেসিপি। যাকে বলা হয় মোত্তি ট্যাকটিক্স।
সঙ্গে আরও দুটো ব্যাপার হয়েছিল। রুশ সেনা যখন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করে তখন গোটা এলাকা ছিল বরফে ঢাকা। রুশ সেনার গায়ে ছিল ট্রাডিশনাল খাকি এবং জলপাই রঙের পোশাক। বরফের মধ্যে ফিনিশ আর্মি সহজেই তাদের চিহ্নিত করতে পারছিল। ফিনিশরা বুদ্ধি করে সাদা রঙের পোশাক পরে যুদ্ধে নামে। ফলে বরফের মধ্যে তারা সহজেই লুকিয়ে থেকে আক্রমণ করত। সাদা সাদা মিলে যাওয়ায় রাশিয়ান আর্মি তাদের চিহ্নিত করতেই পারেনি। আর হল মলোটভ ককটেল। রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করল, তখন রুশ সেনাকে শহরের মধ্যে দেখলে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ মলোটভ ককটেল ছুড়ত। রাশিয়ান আর্মিকে ওয়েলকাম জানাতে বাড়িতে বাড়িতে সবাই এই জিনিসটা তৈরি করতেন। আসলে এটা ফিনিশ আর্মির দান। স্তালিনের আক্রমণের সময়েই তৈরি করেছিল ফিনিশরা। মলোটভ ককটেল আসলে বোতল বোমা। বোতলে থাকে পেট্রোল, কেরোসিন, অ্যালকোহল আর আলকাতরার মিশ্রণ। সিল করা বোতল থেকে বেরিয়ে থাকে পলতে। পলতেয় আগুন দিয়ে বোতল ছুড়ে মারলে প্রবল বিস্ফোরণ হয়। রাশিয়ান ট্যাঙ্ক যখন ঢুকতে শুরু করে তখন ফিনিশ সোলজাররা জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একদম ট্যাঙ্কের পাশে নেমে আসতেন। রুশ সেনা কিছু বোঝার আগেই তাঁরা ট্যাঙ্কের এয়ার ভেন্টের মধ্যে এই বোতল বোমা ঢুকিয়ে দিতেন। বিস্ফোরণে ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়ে যেত।
স্তালিন প্রথম হেলসিঙ্কির ওপর বোমা ফেলা শুরু করেছিলেন। সমালোচনার মুখে পড়ে সেখান থেকে সরে এসে গ্রাউন্ড ইনভেশনে যান। সেইসময় সোভিয়েত বিদেশমন্ত্রী ভিয়াচেস্লাভ মলোটভ ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, বোমা নয়, আমরা তো ফিনিশদের জন্য আকাশ থেকে রুটি ফেলছি। তাই পাল্টা কটাক্ষে ফিনিশরা তাদের বোতল বোমার নাম দিয়েছিল মলোটভ ককটেল। মলোটভের নাম আর নানা তরলের মিশ্রণ বলে ককটেল।
এত বছর পর কেন রাশিয়া-ফিনল্যান্ডের যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা?
কারণ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এই মুহূর্তে দুটো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠেছে ফিনল্যান্ড আর কালিনিনগ্রাদ। কালিনিনগ্রাদ হল মেনল্যান্ড রাশিয়া থেকে অনেকদূরে বাল্টিকের পাড়ে একটা রুশ ভূখণ্ড। একদিকে সমুদ্র। বাকি তিনদিকে পোল্যান্ড আর লিথুয়ানিয়ার সীমান্ত। অনেকটা ভারতের ছিটমহলের মতো। এখানে রয়েছে রুশ সামরিক ঘাঁটি। মজুত করা আছে পরমাণু বোমা। কালিনিনগ্রাদের বন্দরে বরফ পড়ে না। এইসব নানা কারণে এটা রাশিয়ার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির কাছ থেকে কালিনিনগ্রাদ দখলের পর স্তালিন আর তা ফেরত দেননি। এখন ভ্লাদিমির পুতিনের অভিযোগ, বাল্টিকে ঘনঘন মহড়া চালাচ্ছে নেটো। তারা ওখানে নানারকম জ্যামার টাইপের ডিভাইস ইউজ করে কালিনিনগ্রাদ বেস থেকে রাশিয়ার বিমান ওঠানামায় সমস্যা তৈরি করছে। বাল্টিকের পাড়ে ফিনল্যান্ড নতুন দেশ হিসাবে ন্যাটোয় যোগ দেওয়ায় পুতিনের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছে ফিনিশদের ওপর। রুশ সেনা শুরু করেছে হাইব্রিড ওয়ার। পোশাকি নাম অপারেশন ব্ল্যাক ব্যাগ। রুশ সেনার গুপ্তচররা ঢুকে পড়েছে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে।