
মুম্বই: বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে এবার হাই-স্পিড রেল পরিষেবায় স্বনির্ভর হওয়ার পথে ভারত। দেশের মাটিতেই তৈরি হচ্ছে প্রথম স্বদেশি বুলেট ট্রেন (Bullet Train) ‘ভারত ২৮’ (B-28)। বেঙ্গালুরুর ভারত আর্থ মুভার্স লিমিটেড (BEML)-এর কারখানায় তৈরি হচ্ছে এই ট্রেন। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে, ২০২৭ সালের অগস্ট থেকেই মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড (Mumbai-Ahmedabad) করিডরে শুরু হতে পারে এর পরিষেবা। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৮০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম এই ট্রেনে একসঙ্গে সফর করতে পারবেন ৫৫৭ জন যাত্রী। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে আরামদায়ক আসন, ওয়াই-ফাই, বিশেষভাবে সক্ষম যাত্রীদের জন্যও থাকছে নানা সুবিধা।
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ১ নভেম্বর বেঙ্গালুরুতে BEML-এর আদিত্য ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটি পরিদর্শন করেন। সেখানে বুলেট ট্রেনের নির্মাণকাজ খতিয়ে দেখেন তিনি। বর্তমানে ট্রেনের প্রথম কোচের ইন্টিগ্রেটেড কার বডির ‘স্কুইজ টেস্ট’ চলছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে বাইরের প্রবল চাপ ও বিভিন্ন ধরনের শক্তি প্রয়োগের ফলে ট্রেনের কাঠামো কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কাঠামোর নিরাপত্তা ও দৃঢ়তা যাচাই করতেই এই পরীক্ষা।
রেলমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্কুইজ টেস্ট এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে তা সম্পূর্ণ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ট্রেনের কোচে প্রপালশন সিস্টেম ও অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম বসানো হবে। তারপর শুরু হবে জলবায়ু পরীক্ষা। প্রচণ্ড গরম, তীব্র ঠান্ডা এবং ভারী বৃষ্টিতে ট্রেনটি কীভাবে কাজ করে, তা খতিয়ে দেখা হবে। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় ট্রেনের কার্যক্ষমতা যাচাই করা হবে।
প্রায় ২০২ মিটার দীর্ঘ ‘ভারত ২৮’ ট্রেনসেটে থাকবে আটটি কোচ। এর মধ্যে সাতটি স্ট্যান্ডার্ড ক্লাসের এবং একটি এক্সিকিউটিভ ক্লাসের কোচ। ট্রেনটির সর্বোচ্চ পরীক্ষামূলক গতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার হলেও বাণিজ্যিক পরিষেবায় ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার গতিতে চলার জন্য এটি তৈরি করা হচ্ছে।
এই ট্রেনে একসঙ্গে ৫৫৭ জন যাত্রী সফর করতে পারবেন। স্ট্যান্ডার্ড ক্লাসের কোচগুলিতে ৩×২ আসন বিন্যাস থাকবে। এক্সিকিউটিভ ক্লাসের কোচে থাকবে ২×২ আসন বিন্যাস। চারটি মোটর কার ও চারটি ট্রেলার কার নিয়ে তৈরি হবে ট্রেনটি। ট্রেনের দুই প্রান্তে থাকবে চালকের কেবিন। সেখানে থাকবে আধুনিক অনবোর্ড কন্ট্রোল সিস্টেম, যা চালককে ট্রেন পরিচালনা এবং অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারের সঙ্গে সমন্বয় রাখতে সাহায্য করবে।
প্রয়োজনে আটটি কোচের দু’টি ট্রেন জুড়ে ১৬টি কোচের একটি ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। এর ফলে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের আসনসংখ্যা বাড়ানো যাবে।
যাত্রীদের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই ট্রেনের অন্দরসজ্জা তৈরি করা হচ্ছে। থাকছে আরামদায়ক আসন, পা রাখার পর্যাপ্ত জায়গা এবং প্রতিটি সারির পাশে বড় জানলা। যাত্রীদের জন্য থাকবে এলইডি আলো, মাথার উপরে লাগেজ রাখার র্যাক এবং বড় ব্যাগ রাখার জন্য আলাদা জায়গা।
প্রতিটি যাত্রীর জন্য থাকবে পৃথক চার্জিং পয়েন্ট। ফলে সফরের সময় মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ চার্জ করা যাবে। ওয়াই-ফাই ভিত্তিক ইনফোটেনমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীরা বিনোদনের সুযোগ পাবেন। কোচের ভিতরে থাকা এলসিডি ডিসপ্লেতে ইংরেজি, হিন্দি ও আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন তথ্য জানানো হবে।
যাত্রীদের সঙ্গে ট্রেনের কর্মীদের যোগাযোগের জন্য কোচের ভিতরে এবং কোচের সংযোগস্থলে থাকবে জরুরি টক-ব্যাক ইউনিট। পাশাপাশি থাকবে বায়ো-ডাইজেস্টার টয়লেট এবং সারা বছর আরামদায়ক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং (HVAC) ব্যবস্থা।
‘ভারত ২৮’ ট্রেনে বিশেষভাবে সক্ষম এবং চলাফেরায় অসুবিধা রয়েছে, এমন যাত্রীদের জন্য একাধিক সুবিধা রাখা হচ্ছে। ট্রেনের মেঝে প্ল্যাটফর্মের সমান উচ্চতায় থাকবে। ফলে ট্রেনে ওঠানামা করতে সুবিধা হবে। দরজায় থাকবে বিশেষ পাদানি, যা প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরে বেরিয়ে এসে ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যবর্তী ফাঁক কমাবে। এছাড়াও থাকবে হুইলচেয়ার চলাচলের উপযোগী দরজা, বিশেষ আসন এবং বিশেষভাবে সক্ষম যাত্রীদের শৌচাগার।
এই ট্রেন চলবে ২৫ কেভি এসি ওভারহেড বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায়। শক্তি সাশ্রয়ের জন্য ব্যবহার করা হবে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং প্রযুক্তি। ট্রেনের গতি কমানোর সময় উৎপন্ন শক্তি ফের বৈদ্যুতিক গ্রিডে পাঠানো সম্ভব হবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে। ফলে বিদ্যুতের খরচ কমাতে সাহায্য করবে ট্রেনটি।ট্রেনের সামনের অংশ এবং সম্পূর্ণ বডি কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে অ্যারোডায়নামিক নকশায় তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে বাতাসের বাধা ও অস্থিরতা কমবে। বিশেষত সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় চাপের তরঙ্গ এবং শব্দ কমানোর লক্ষ্যেই এই নকশা তৈরি করা হয়েছে।
রেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল করিডরের প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সুরাত-ভাপি অংশে এই ট্রেনের পরীক্ষামূলক দৌড় শুরু হতে পারে। ২০২৭ সালের অগস্ট থেকে বাণিজ্যিক পরিষেবা শুরুর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।BEML-এ তৈরি হচ্ছে প্রথম দু’টি স্বদেশি বুলেট ট্রেন। প্রতিটি ট্রেনেই থাকবে আটটি করে কোচ। ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মুম্বই-আমদাবাদ হাই-স্পিড রেল করিডর ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য রয়েছে।