
মুম্বই: এন চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ নিয়ে বেঁকে বসল টাটা ট্রাস্ট। টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসাবে এন চন্দ্রশেখরনকে পুনরায় নিয়োগ করার যে প্রস্তাবনা পাশ করা হয়েছে, তা আইনত বৈধ নয়। এমনটাই দাবি টাটা ট্রাস্টের। তাদের বক্তব্য, ট্রাস্ট ও মনোনীত ডিরেক্টরদের থেকে যে বাধ্যতামূলক সমর্থনের প্রয়োজন ছিল, তা পাননি চন্দ্রশেখরন।
টাটা মানেই রতন টাটার কথা মাথায় আসে। তবে তাঁর প্রয়াণের পর থেকেই টাটা গোষ্ঠীর উপর দিয়ে অনেক ঝড়-ঝাপটা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গত অগস্ট মাসে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার ঘোষণা করেছিলেন এন চন্দ্রশেখরন। ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় এই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দিন কয়েক আগেই, বোর্ড মিটিংয়ে ফের একবার এন চন্দ্রশেখরনকেই টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বোর্ডের পাঁচ সদস্যের মধ্যে চার সদস্যই প্রস্তাবের সমর্থনে ভোট দেন। একমাত্র নোয়েল টাটা আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এন চন্দ্রশেখরনের চেয়ারম্যান পদে থাকা নিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ডে ৪:১ ভোটে প্রস্তাব পাশ হলেও, সেই সিদ্ধান্তকে মান্যতা দিতে নারাজ টাটা ট্রাস্টস। তাদের দাবি, শুধু বোর্ডে বেশি ভোট পেলেই কোনও সিদ্ধান্ত বৈধ হয়ে যায় না। সংস্থার আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশনের (Articles of Association) যে বিশেষ নিয়ম রয়েছে, সেই নিয়মও মানতে হবে।
তাদের বক্তব্য, ৪:১ ভোটের কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই, কারণ দুইজন নমিনির মধ্যে একজন এই প্রস্তাবে আপত্তি করেছেন। এরফলে কোম্পানির যে আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে শর্ত রয়েছে, তা পূরণ হচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, টাটা সন্সে টাটা ট্রাস্টের ৬৬ শতাংশ অধিকার রয়েছে। টাটা ট্রাস্টের দুইজন নমিনি ডিরেক্টর এর বোর্ডের সদস্য। কোনও প্রস্তাব পাশ করানোর জন্য এই দুই নমিনিরই সমর্থনের প্রয়োজন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ডে চন্দ্রশেখরনকে চেয়ারম্যান পদে রাখার পক্ষে ৪ জন ডিরেক্টর ভোট দেন। বিরোধিতা করেন নোয়েল টাটা। তিনি টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান এবং টাটা সন্সেরও একজন ডিরেক্টর। এরপরই ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে টাটা ট্রাস্টস।
টাটা সন্সের সংস্থার নিয়ম বা আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, বোর্ডের কোনও সিদ্ধান্ত শুধু মোট কতজন ডিরেক্টর সপক্ষে ভোট দিলেন, তা দিয়ে ঠিক করা যায় না। টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য, ট্রাস্টসের মনোনীত ডিরেক্টরদের মধ্যেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু চন্দ্রশেখরনের বিষয়ে ট্রাস্টসের দুই মনোনীত ডিরেক্টরের মধ্যে একজন বিরোধিতা করেছেন। ফলে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়নি।
সেই কারণেই ৪:১ ভোটকে তারা যথেষ্ট বলে মনে করছে না। টাটা ট্রাস্টসের বক্তব্য, কোনও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—সেটিই আসল বিষয়। সেই শর্ত পূরণ না হলে শুধু বেশি ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে না।
এমনকি টাটা ট্রাস্টস এই প্রস্তাবকে “void ab initio” অর্থাৎ শুরু থেকেই অবৈধ বলে দাবি করেছে।
চন্দ্রশেখরনের চেয়ারম্যান পদে থাকা নিয়ে ট্রাস্টসের আপত্তির কারণে বোর্ডে অচলাবস্থা বা ‘deadlock’ তৈরি হয়েছিল- এই দাবিও খারিজ করেছে টাটা ট্রাস্টস। তাদের বক্তব্য, বোর্ডে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি তোলা হয়েছিল এবং সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী সেই সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়নি। ফলে এটিকে অচলাবস্থা বলা যায় না।
টাটা ট্রাস্টস আরও জানিয়েছে, চেয়ারম্যানের কাস্টিং ভোট (casting vote) শুধুমাত্র তখনই ব্যবহার করা যায়, যখন বোর্ডের সামগ্রিক ভোট সমান হয়ে যায়। ট্রাস্টসের মনোনীত ডিরেক্টরদের জন্য আলাদা যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন রয়েছে, সেই ঘাটতি কাস্টিং ভোট দিয়ে পূরণ করা যায় না বলেই তাদের দাবি।
এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ট্রাস্টসের বক্তব্য, চন্দ্রশেখরনকে আইনগত ভাবে পুনরায় চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
চন্দ্রশেখরনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়েছে। এর আগে অগস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নতুন করে চেয়ারম্যান হতে চান না। তাঁর বর্তমান মেয়াদ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা।
এর পরেই দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট পরবর্তী চেয়ারম্যান বেছে নেওয়ার জন্য একটি নির্বাচন কমিটি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। কিন্তু ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ড চন্দ্রশেখরনকেই চেয়ারম্যান করার পক্ষে ভোট দেওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়।
এখন নজর টাটা সন্সের পরবর্তী বার্ষিক সাধারণ সভা বা অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং (Annual General Meeting)-র দিকে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই বৈঠক হওয়ার কথা।
চন্দ্রশেখরনকে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসাবে ফের নিয়োগের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। টাটা সন্সে দুই প্রধান ট্রাস্ট—স্যর দোরাবজি টাটা ট্রাস্ট (Sir Dorabji Tata Trust) এবং স্যর রতন টাটা ট্রাস্ট (Sir Ratan Tata Trust)-র সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদারিত্ব রয়েছে। ফলে এই বিষয়ে টাটা ট্রাস্টসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এখানেও রয়েছে জটিলতা। মহারাষ্ট্র চ্যারিটি কমিশনারের সামনে চলা মামলার কারণে স্যর রতন টাটা ট্রাস্ট বর্তমানে ট্রাস্টি বৈঠক ডাকতে পারছে না। এর প্রভাব আগেও টাটা সন্সের সিদ্ধান্তে পড়েছে। গত ১৮ অগস্ট টাটা সন্সের বার্ষিক জেনারেল মিটিং হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই ট্রাস্ট যৌথভাবে প্রয়োজনীয় প্রতিনিধি মনোনীত করতে না পারায় সেই বৈঠক স্থগিত হয়ে যায়।
জেনারেল মিটিংয়ের আগে ট্রাস্টগুলির মধ্যে এই সমস্যা মিটবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ চন্দ্রশেখরনকে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হিসাবে ফের নিয়োগের সময় দুই ট্রাস্টের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।