
সিনেমার নিজস্ব একটা ভাষা থাকে। আর সেই ভাষাকে সাধারণ দর্শকের কাছে সহজ করে তুলে ধরেন একজন প্রকৃত সমালোচক। ঠিক এই কাজটাই গত তিন দশক ধরে নিপুণভাবে করে আসছেন টিভি৯ ভারতবর্ষের অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর এবং চলচ্চিত্র সমালোচক সঞ্জীব শ্রীবাস্তব। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর এই দীর্ঘ ও অনবদ্য অবদানের জন্যই ৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের মঞ্চে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র সমালোচক বা ‘বেস্ট ফিল্ম ক্রিটিক’-এর সম্মান তাঁর ঝুলিতে। সম্প্রতি টিভি৯ ভারতবর্ষের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের এই দীর্ঘ যাত্রা, বর্তমান সিনেমা এবং সমালোচনা নিয়ে মন খোলা আড্ডায় মেতেছিলেন এই বর্ষীয়ান সাংবাদিক।
গুজরাটের কেভাদিয়ায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতির হাত থেকে ‘স্বর্ণকমল’, বিশেষ ব্যাজ এবং শংসাপত্র গ্রহণ করেছেন তিনি। পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তটি স্মরণ করে তিনি জানান, পিআইবি-র সাংবাদিক বৈঠকের ঠিক আগে একটি অচেনা নম্বর থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে। এরপর নিজের কানে নিজের নাম প্রথম ঘোষণা হতে শোনার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে তিনি বলেন, “খবরটা যখন পাই, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। আমি একেবারে হতবাক ছিলাম। আজও যখন এই কথা বলছি, আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে যে আমাকেও এই পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।” এই অসামান্য সাফল্যের পিছনে টিভি৯ ভারতবর্ষের অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। সঞ্জীব বলেন, “টিভি৯ ভারতবর্ষের হিন্দি ওয়েবসাইটে আমাকে সিনেমা নিয়ে লেখার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এর জন্য আমি আমার প্রতিষ্ঠানের কাছে কৃতজ্ঞ।” বরিষ্ঠ সহকর্মীরা তাঁকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন বলেই আজ এই জাতীয় স্বীকৃতি মিলেছে।
সিনেমা সমালোচনা নিয়ে তাঁর ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর মতে, সমালোচকদের কখনও বিচারক হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, “চলচ্চিত্র সমালোচকরা বিচারপতি নন। সিনেমাটা আমার পছন্দ হয়নি বা খুব পছন্দ হয়েছে, এটা কোনও সমালোচনা হতে পারে না।” ব্যক্তিগত প্রত্যাশা সরিয়ে রেখে গল্পের বুনন, অভিনয় এবং পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সার্থক হল, সেটাই নিখুঁতভাবে তুলে ধরা একজন পেশাদার সমালোচকের কাজ। আজকালকার রিভিউর মান নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে সঞ্জীব বলেন, “আজ যদি কোনও ভালো ছবি বক্স অফিসে না চলে, তবে তার পিছনে ৯০ শতাংশ অবদান থাকে খারাপ রিভিউর।” তাই সিনেমার ভুল ধরার পাশাপাশি ভালো দিকগুলোও দর্শকের সামনে তুলে ধরা উচিত। বর্তমান ভারতীয় সিনেমা প্রসঙ্গে তিনি পরিচালকদের কাছে বিশেষ অনুরোধ রাখেন। শুধুমাত্র হলিউড বা কোরিয়ান ছবির রিমেক না করে প্রেমচাঁদ বা ফণীশ্বরনাথ রেণুর মতো বরেণ্য সাহিত্যিকদের রচনা, যেমন ‘গোদান’, ‘গবন’ বা ‘ময়লা আঁচল’-এর উপর ভিত্তি করে দেশীয় গল্প তুলে ধরার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রশংসা করে সঞ্জীব জানান, এই মাধ্যম গল্প বলার ধরণ একেবারে বদলে দিয়েছে এবং অনেক প্রতিভাবান অভিনেতাকে নতুন করে দর্শকের সামনে নিয়ে এসেছে।
সঞ্জীব শ্রীবাস্তবের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। মহেশ ভাটের ‘সড়ক’ ছবির একটি গানের পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর লেখার হাতেখড়ি। এরপর ২০০০ সালে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে তাঁর লেখা একটি বিশেষ নিবন্ধ তাঁকে সিনেমা জগতে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। কাজের প্রতি তাঁর ডেডিকেশন রীতিমতো মুগ্ধ করার মতো। সকাল ৭টায় বেরিয়ে ব্যাক-টু-ব্যাক একাধিক সিনেমা দেখে গভীর রাত পর্যন্ত তার রিভিউ লেখার কাজ করেন তিনি। ভবিষ্যতেও তিনি এই যাত্রা অব্যাহত রাখতে চান। তাঁর কথায়, “আমি চাই হিন্দিতে সিনেমার খবর ও রিভিউর জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে।” পাশাপাশি তিনি নিজে একজন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তাঁর নিজের লেখা গল্প বা উপন্যাস নিয়ে আগামী দিনে সিনেমা তৈরি হোক, এই প্রত্যাশাই রাখেন স্বর্ণকমল জয়ী এই সমালোচক।