
পর্দার সামনে তারকাদের রূপ যাঁরা নিখুঁত করেন, তাঁরা সাধারণত ক্যামেরার পেছনেই থাকেন। সোমনাথ কুণ্ডু (Somnath Kundu) এমনই এক নাম, যাঁর হাতের জাদুতে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীর চরিত্র পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে এবার জাতীয় পুরস্কারজয়ী এই রূপটান শিল্পী নিজেই এক বড় পরিবর্তনের কারিগর। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। আর তার সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে টলিপাড়ার স্টুডিওগুলোতেও। দীর্ঘদিনের চর্চিত ‘ব্যান কালচার’ বা ‘থ্রেট কালচার’-এর আতঙ্ক কাটিয়ে টলিউডের মেকআপ গিল্ডের নতুন সভাপতি নির্বাচিত হলেন সোমনাথ। একসময় যে ‘ব্যান কালচার’-এর কোপে তাঁকেও পড়তে হয়েছিল, পালাবদলের পর এবার গিল্ডের রাশ ধরলেন তিনি।
কী বলেছেন তিনি?
সভাপতি পদে বসার পর স্বভাবতই খুশি তিনি। তবে জানেন, এই চেয়ারের ভার নেহাত কম নয়। টিভি ৯ বাংলাকে তিনি জানিয়েছেন, এখন তাঁর দায়িত্ব অনেক বেশি। তাঁর কথায়, “নিজের ফ্যামিলি চালানোর একটা দায়িত্ব, তারপরে ভালো মেকআপ করার যেমনই একটা দায়িত্ব ছবিতে, তেমনি একটা সংগঠনকে ঠিক পথে নিয়ে যাওয়া, প্রতিটি মানুষ যাতে কাজ পায় তার দিকে নজর দেওয়া, এটাও একটা বড় দায়িত্ব।” তাঁর স্পষ্ট কথা, গিল্ডের প্রত্যেক সদস্যের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই তাঁর প্রথম কাজ।
বিগত কয়েক বছরে গিল্ডের অন্দরে ঠিক কী চলছিল?
সোমনাথের গলাতেও শোনা গেল আক্ষেপের সুর। অতীত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “যেভাবে গিল্ডগুলো চলছিল… আমরা ধন্দে পড়ে গেছিলাম আমাদের অস্তিত্ব থাকবে কিনা, বিশেষ কিছু কারণের জন্য, বিশেষ কিছু ঘোষণার ফলে।” এই চরম অনিশ্চয়তা আর অস্তিত্বের সংকট থেকে গিল্ডকে বাঁচাতেই তাঁর এই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া।
স্টুডিও পাড়ায় একটা সময় কাজ হারানোর যে অদৃশ্য ভয় কাজ করত, নতুন সভাপতি চাইছেন সেই অধ্যায় চিরতরে মুছে ফেলতে। সোমনাথের কথায়, “যে ব্যান কালচার, যে থ্রেট কালচার একসময় ছিল, সেসব দূরে সরিয়ে নতুন করে ভোট করে এই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।” অতীতে তাঁকেও বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাঁর অঙ্গীকার, “আমি চেষ্টা করব, যে বাধার মুখে আমাকে পড়তে হয়েছিল তা যেন আর কাউকে না সহ্য করতে হয়।”
সোমনাথ জানান দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে গিল্ডে ভোট হল। রাজ্যের রাজনৈতিক রদবদলের পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে বলে মনে করছেন নতুন গিল্ড সভাপতি। বর্তমান প্রশাসনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আমরা এখন অত্যন্ত একটা আশাবাদী সরকারের অধীনে পাঁচ-ছ’মাস কাটিয়ে দিয়েছি এবং তাঁরা আমাদেরকে ভয় আউট, ভরসা ইন এর কথাই বলেছেন।” অর্থাৎ, সদস্যদের কাজ নিয়ে যাতে আর কোনও ভীতি না থাকে, সেই বার্তাই দিতে চেয়েছেন তিনি।
এই নতুন পথচলায় যাঁদের সাহায্য পেয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সোমনাথ। রাজ্যের ট্রেড ইউনিয়ন, লেবার কমিশন এবং আইএনটিসিইউ-এর আধিকারিকদের পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তীর কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি। সোমনাথ বলেন, “আমি কৃতজ্ঞ মহাগুরু মিঠুনদা, রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী, হিরণ চট্টোপাধ্যায় , রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে।” তিনি আরও জানান, টলিপাড়ার এই বিষয়গুলো দেখার জন্য স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মিঠুন চক্রবর্তীকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি, ইন্ডাস্ট্রির অভিভাবক হিসেবে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, জিৎ-এর মতো তারকারাও তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
আগামিদিনে মেকআপ গিল্ডকে ঠিক কোথায় দেখতে চান?
সোমনাথের সোজা সাপটা উত্তর, গিল্ডের সবার মুখে হাসি ফোটানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। তিনি চান, ভিন রাজ্য বা দেশের বাইরে থেকে যে সমস্ত মেকআপ আর্টিস্টরা টলিউডে কাজ করতে আসবেন, তাঁরাও যেন এখানকার সুস্থ ও ভয়হীন পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন। টলিউডের নাম যাতে আরও উজ্জ্বল হয়, সেই লক্ষ্যেই এবার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ শুরু করল মেকআপ গিল্ড।