
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো মানেই বনেদি বাড়ির সাবেকি পুজোর এক আলাদা জৌলুস এবং আকর্ষণ। আর কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর কথা উঠলেই ভবানীপুরের মল্লিকবাড়ির নাম স্বাভাবিকভাবেই সবার আগে উঠে আসে। এবার ১০২ বছরে পা দিল এই বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী পুজো। মহাঅষ্টমীর সকালে একেবারে অন্যরকম এবং জমজমাট উৎসবের মেজাজ দেখা গেল মল্লিক পরিবারে। রূপোলি পর্দার গ্ল্যামার এবং তারকাখ্যাতি সরিয়ে রেখে এই কটা দিন একেবারে সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক।
মহাঅষ্টমীর সকাল থেকেই পুজোর নানা প্রস্তুতিতে মেতে উঠেছে গোটা মল্লিক পরিবার। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি ঠাকুরদালানে উপস্থিত সবার নজর কেড়েছে মল্লিকবাড়ির জমজমাট আরতি পর্ব। ধুনোর ধোঁয়া এবং ঢাকের বাদ্যির মাঝে এক অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আরতির সময় পরিবারের সবার হাতে প্রদীপ তুলে দিতে দেখা যায় কোয়েলকে। শাড়ির সাজে অভিনেত্রীর চোখেমুখে ছিল উৎসবের স্পষ্ট আনন্দ এবং উচ্ছ্বাস। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান এবং স্বনামধন্য অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকও। বয়সের তোয়াক্কা না করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজেও পুজোর প্রতিটি আচার অনুষ্ঠানে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
অষ্টমীর পুণ্য তিথিতে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া ছাড়া দুর্গাপুজো একেবারে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সেই সাবেকি নিয়ম এবং রীতি মেনে আরতির পরেই শুরু হয় মল্লিকবাড়ির ঐতিহ্যবাহী অঞ্জলি পর্ব। পরিবারের ছোট থেকে বড়, সকলেই একসঙ্গে মিলিত হয়ে দেবীর পায়ে ফুল এবং বেলপাতা দিয়ে ভক্তিভরে প্রার্থনা করেন। পরিবারের সকলকে সঙ্গে নিয়ে কোয়েল মল্লিক নিজেও পরম নিষ্ঠার সঙ্গে অঞ্জলি দিয়েছেন। এই সময় ঠাকুরদালানে যেন এক আনন্দের হাট বসেছিল।
সাবেকিয়ানা, ভক্তি এবং আভিজাত্যের এক নিখুঁত মেলবন্ধন হল ভবানীপুরের এই প্রাচীন পুজো। এখানে কোনও কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই, আছে শুধুই একান্নবর্তী পরিবারের একতা এবং আন্তরিকতা। সারা বছরের সমস্ত কাজের ব্যস্ততা সরিয়ে রেখে উৎসবের এই বিশেষ দিনগুলোয় সবাই একসঙ্গে মিলিত হন এই ঠাকুরদালানে। প্রদীপের আলো, ধুনোর গন্ধ এবং পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে মহাঅষ্টমীর সুন্দর সকালটা মল্লিকবাড়িতে যেন এক টুকরো পুরনো কলকাতার নস্টালজিয়া তৈরি করেছে। আধুনিকতা এবং ডিজিটাল দুনিয়ার হাজারো চাকচিক্যের ভিড়েও ভবানীপুরের এই সাবেকি পুজোর জৌলুস এবং আকর্ষণ সাধারণ মানুষের কাছে আজও সমানভাবে অমলিন।
মল্লিকবাড়ির পুজোর অন্যতম বড় আকর্ষণ হল কুমারীপুজো। সেই পর্ব মিটতেই শুরু হয় আরতি। সাবেকি রীতি মেনে পুজোর সময় নিজের হাতে শঙ্খ বাজাতেও দেখা গিয়েছে কোয়েলকে। অষ্টমীর সকালে অভিনেত্রীর সাজ ছিল একেবারে সাবেকি ও ছিমছাম। পরনে লাল শাড়ি এবং হলুদ সুতোর কাজ করা ব্লাউজ, কপালে লাল টিপ, চুলে খোঁপা আর মানানসই হালকা গয়নায় সেজেছিলেন তিনি। অন্যদিকে রঞ্জিত মল্লিক বরাবরের মতো পরেছিলেন নীল সুতোর কাজ করা সাদা পাঞ্জাবি এবং সাদা ধুতি।
পুজোর বাড়িতে আলাদা করে নজর কেড়েছে কোয়েলের দুই সন্তান কবীর ও কাব্য। মায়ের সঙ্গে রং মিলিয়ে কবীরের পরনে ছিল হলুদ পাঞ্জাবি, আর কাব্যের সাজ ছিল লাল টপ ও হলুদ স্কার্টে। কোয়েলের স্বামী প্রযোজক নিসপাল রানের পরনেও দেখা গিয়েছে হলুদ পাঞ্জাবি। অর্থাৎ, গোটা পরিবারের পোশাকেই ছিল দারুণ রংমিলান্তি। একদিকে ছোটদের সঙ্গে দাদুর খুনসুটি, অন্যদিকে নিসপাল রানের নিখুঁত হাতে বাবার দায়িত্ব সামলানোর মুহূর্ত— সব মিলিয়ে সাবেকি দুর্গোৎসবের চেনা ছবিতে নতুন করে ধরা দিয়েছে মল্লিক পরিবার।