AQI
TV9 Network
User
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

Anik Dutta: ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ অন্ধকার, নিভে গেল অনীক দত্তের জীবনের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’

Film director Anik Dutta film journey: এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৩ সালে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তিনি পরিচালনা করেন ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ (Ascharya Pradeep)। আধুনিক মধ্যবিত্তের সীমাহীন লোভ আর কর্পোরেট দুনিয়ার মায়াজালকে এক ফ্যান্টাসি-স্যাটায়ারের মোড়কে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি।

Anik Dutta: 'ভূতের ভবিষ্যৎ' অন্ধকার, নিভে গেল অনীক দত্তের জীবনের 'আশ্চর্য প্রদীপ'
| Updated on: May 27, 2026 | 4:00 PM
Share

বুধবার যে টলিপাড়া এমন একটা দিন দেখবে তা যেন সকাল থেকে আন্দাজ করতে পারেননি কেউ। হঠাৎই শোকের খবর। প্রয়াত টলিউডের জনপ্রিয় পরিচালক অনীক দত্ত। তাঁর মৃত্যু ঘরে রহস্যের ধোঁয়া। বুধবার প্রথমে খবর পাওয়া যায়, ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন অনীক। তাঁকে সঙ্কটজনক অবস্থায় ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় পরিচালকের।

সমকালীন বাংলা চলচ্চিত্রে যখন ফর্মুলা ছবির একঘেয়েমি আর সস্তা মেলোড্রামার ভিড়, ঠিক তখনই  এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতো আগমন ঘটেছিল অনীক দত্তর ছবির। টলিউডের মূলধারার চেনা ছকটাকে ভেঙে চুরমার করে, তীক্ষ্ণ রসবোধ আর বুদ্ধিমত্তার মিশেলে যিনি বাঙালি দর্শককে নতুন করে সিনেমা হলে টানতে বাধ্য করেছিলেন। কেবল একজন পরিচালক হিসেবে নন, চিত্রনাট্যকার এবং গীতিকার হিসেবেও বাংলা সিনেমার আঙিনায় তিনি নিজের এক স্বতন্ত্র ঘরানা তৈরি করেছেন।

২০১২ সালে এক অভাবনীয় ধামাকা দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে অনীক দত্তের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাঁর প্রথম ছবি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ (Bhooter Bhabishyat) রাতারাতি ‘কাল্ট ক্লাসিক’-এর মর্যাদা পায়। কলকাতার এক পুরনো ভুতুড়ে বাড়িকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক কমেডিটি বক্স অফিসে ইতিহাস তৈরি করেছিল। ছবির সংলাপ থেকে শুরু করে প্রতিটি চরিত্রের নামকরণ এবং বাঙালি নস্টালজিয়ার সঙ্গে আধুনিক পুঁজিবাদের সংঘাত— অনীক দত্ত দেখিয়ে দিয়েছিলেন কীভাবে স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গকৌতুককে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৩ সালে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তিনি পরিচালনা করেন ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ (Ascharya Pradeep)। আধুনিক মধ্যবিত্তের সীমাহীন লোভ আর কর্পোরেট দুনিয়ার মায়াজালকে এক ফ্যান্টাসি-স্যাটায়ারের মোড়কে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি। এই ছবির গানগুলোর গীতিকারও ছিলেন তিনি নিজেই, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেয়। ২০১৭ সালে তিনি উপহার দেন থ্রিলার ছবি ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ (Meghnad Badh Rahasya)। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাকাব্যের আবহে বোনা এই রহস্য-রোমাঞ্চ ছবিটিতে পরিচালকের মগজাস্ত্রের পরিচয় আরও একবার স্পষ্ট হয়।

২০১৯ সালে মুক্তি পায় ‘ভবিষ্যতের ভূত’ (Bhobishyoter Bhoot), যা নানা রাজনৈতিক বিতর্কের মুখোমুখি হলেও পরিচালকের আপসহীন মানসিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এর ঠিক পরের বছরই, ২০২০ সালে মুক্তি পায় ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ (Borunbabur Bondhu)। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত এই ছবিটিতে এক একাকী, নীতিবান বৃদ্ধের জীবনের জটিল সামাজিক ও পারিবারিক মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরিচালক।

তবে অনীক দত্তের চলচ্চিত্র জীবনের অন্যতম সেরা কীর্তি হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ২০২২ সালের ‘অপরাজিত’ (Aparajito) ছবিটি। কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষে এটি ছিল পরিচালকের এক পরম শ্রদ্ধার্ঘ্য। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির নেপথ্য লড়াইয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই সাদা-কালো বায়োগ্রাফিক্যাল ড্রামাটি দেশ-বিদেশে বিপুল প্রশংসা কুড়োয়। জীতু কামালের মধ্যে ‘অপরাজিত রায়’ হিসেবে সত্যজিৎ রায়কে পুনরুজ্জীবিত করার যে সাহস ও মুন্সিয়ানা অনীক দত্ত দেখিয়েছেন, তা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্মরণীয়।

থামবার পাত্র যে তিনি ছিলেন না, তা প্রমাণিত হয় ২০১৫ সালে তাঁর নতুন গোয়েন্দা থ্রিলার ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ (Joto Kando Kolkatatei)-এর হাত ধরে। ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই এই ছবিটি নিয়ে সিনেমা-অনুরাগীদের মধ্যে তুমুল উন্মাদনা তৈরি হয়। এই ছবিতেও নিজের স্টাইলের স্বাক্ষর রেখেছিলেন অনীক দত্ত।

অনীক দত্তের সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার মাটির কাছাকাছি থাকা শিকড়ের টান এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ। তাঁর প্রতিটি ছবিই যেন সমাজকে আয়না দেখায়, কিন্তু তা কখনও মেলোড্রামাটিক বা একঘেয়ে উপদেশমূলক হয়ে ওঠে না; বরং তা হয় বুদ্ধিমত্তার রসে সিক্ত। বাঙালি সংস্কৃতির রেনেসাঁকে সেলুলয়েডে ধরে রাখার এই যে অনলস প্রয়াস, তা অনীক দত্তকে সমসাময়িক টলিউডের অন্যতম সেরা এবং ব্যতিক্রমী ‘অট্যুর’ (Auteur) বা চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সেই অধ্যায়ই যেন আচমকা শেষ হয়ে গেল।

Follow Us