
পড়া না পারলে ছোটবেলায় শিক্ষকের মার কিংবা বকুনি খায়নি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দায়। কিন্তু সেই বকুনির জের যে কাউকে সরাসরি ফ্রান্সের বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিতে পারে, তা বোধহয় ভাবেননি খোদ ‘লাফটারসেন’ ওরফে নিরঞ্জন মণ্ডল (Niranjan Mandal)। সমাজমাধ্যমের পাতায় যিনি কখনও হাসির ফোয়ারা ছোটান, কখনও আবার স্পর্শকাতর বিষয়ে মন ছুঁয়ে যান নেটিজেনদের। সেই চেনা মুখটিই এবার ইতিহাস গড়ে ফেললেন ৭৯ তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে (Cannes Film Festival)। প্রথম বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কানের ঐতিহ্যবাহী লাল গালিচায় সগর্বে হেঁটে এলেন তিনি। আর সেখানে পা রেখেই মনে পড়ে গেল স্কুলের অঙ্কের ক্লাসের এক চরম অপমানের কথা।
কান সৈকতের চড়া আলোয় যখন তাবড় আন্তর্জাতিক তারকারা কেতাদুরস্ত ওয়েস্টার্ন পোশাকে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সেখানে এক টুকরো খাঁটি বাঙালি সংস্কৃতির স্বাদ নিয়ে হাজির হলেন নিরঞ্জন। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি, ওপরে চাপানো কালো কোট। চোখে সাবেকি ফ্রেমের চশমা আর হাতে পুরনো দিনের একটি ঘড়ি। একেবারে খাস ‘বাঙালিবাবু’র এই অবতার দেখে বিদেশি আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল বারবার। শুধু সাজগোজেই নয়, সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতায় মন জয় করে নিলেন সবার। হাসিমুখে নিজের হাতের ঘড়িটির গল্প শোনালেন, বোঝালেন এই সাবেকিয়ানার মর্ম। কানের রেড কার্পেটে হাঁটার অভিজ্ঞতা কেমন? মুখে চওড়া হাসি নিয়ে জানালেন, “বেশ নার্ভাস লাগছে, আবার একই সঙ্গে প্রচণ্ড উত্তেজিতও।”
তবে এই সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়েও নিরঞ্জন ভোলেননি তাঁর ফেলে আসা অতীতকে। ফ্রান্সে পৌঁছেই সমাজমাধ্যমে অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন এক অদ্ভুত স্মৃতিকথা। ছাত্রজীবনে একবার গণিতের একটি সহজ ফর্মুলা ভুলে গিয়েছিলেন তিনি। তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর এক শিক্ষক কটূক্তি করে বলেছিলেন, ‘জীবনে খুব বেশি দূর এগোতে পারবে না।’ ভাগ্যের কী পরিহাস! আজ সেই শিক্ষকের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করে ফ্রান্সের মাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মজার ছলে নিরঞ্জন বললেন, “ফ্রান্স দিয়ে জার্নি শুরু করলাম। তবুও কাঁদছি, কারণ এখনও আমি এ স্কোয়ার প্লাস বি স্কোয়ারের (a^2 + b^2) ফর্মুলা মনে করতে পারছি না!” শিক্ষকের সেই পুরনো অপমানের এমন মিষ্টি অথচ মোক্ষম জবাব বোধহয় কেবল একজন ক্রিয়েটরের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব।
১৪ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত ফ্রান্সে থাকছেন নিরঞ্জন। গত বছর সন্দীপ্তা সেনের সঙ্গে ‘বীরাঙ্গনা’ ওয়েব সিরিজে অভিনয় করে ওপার বাংলা ও এপার বাংলার দর্শকদের মন জিতেছিলেন তিনি। আর এবার তো বিশ্বমঞ্চে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করলেন। সমাজমাধ্যমে এখন শুধু তাঁরই জয়জয়কার, অনুরাগীদের শুভেচ্ছার জোয়ারে ভাসছেন এই ‘বাঙালিবাবু’। অঙ্কের ক্লাসের সেই ‘সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া’ ছেলেটির কান-জয় কিন্তু প্রমাণ করে দিল, নিজের প্রতিভায় ভরসা রাখলে সত্যি সত্যিই জীবনে অনেকটা দূর এগিয়ে যাওয়া যায়।