পুলিশ ব্যান্ডের গায়ক থেকে ইন্ডিয়ান আইডল, কীভাবে দার্জিলিঙের প্রশান্ত তামাং হয়ে উঠলেন দেশের চোখের মণি?
পাহাড়ের সাধারণ এক পুলিশ কর্মী থেকে রাতারাতি গোটা দেশের চোখের মণি হয়ে ওঠা— প্রশান্ত তামাংয়ের এই সফরটি ছিল ঠিক সিনেমার গল্পের মতো। ২০০৭ সালে ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ সিজন-৩-এর মঞ্চে তাঁর বিজয় কেবল এক গায়কের জয় ছিল না, তা ছিল এক জনজাতির আবেগ এবং এক সাধারণ মানুষের স্বপ্নপূরণের আখ্যান।

পাহাড়ের বুকের একফালি রোদ ছিলেন তিনি। ঠোঁটের কোণে সদা মিষ্টি হাসি। সেই হাসিমুখ হারাল গোটা দার্জিলিং। গোটা দেশ। প্রশান্ত তামাং। যাঁর সুরেলা কণ্ঠ জিতে নিয়েছিল সবার মন। সেই সুরেলা পথ শেষ হল রবিবার। মাত্র ৪৩ বছর বয়স। রবিবার অকালেই চলে গেলেন প্রশান্ত। তাঁর মৃত্য এখনও মানতে পারছে না ভক্তরা। অনুরাগীদের নস্ট্যালজিয়াতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাহাড় থেকে সমতল এবং আকাশ ছোঁয়া সাফল্য।
পাহাড়ের সাধারণ এক পুলিশ কর্মী থেকে রাতারাতি গোটা দেশের চোখের মণি হয়ে ওঠা— প্রশান্ত তামাংয়ের এই সফরটি ছিল ঠিক সিনেমার গল্পের মতো। ২০০৭ সালে ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ সিজন-৩-এর মঞ্চে তাঁর বিজয় কেবল এক গায়কের জয় ছিল না, তা ছিল এক জনজাতির আবেগ এবং এক সাধারণ মানুষের স্বপ্নপূরণের আখ্যান।
দার্জিলিংয়ের ছেলে প্রশান্ত তামাং তাঁর বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরার জন্য কলকাতা পুলিশে যোগ দেন। তিনি কলকাতা পুলিশ ব্যান্ডের একজন গায়ক ছিলেন। গান গাইতে ভালবাসতেন, কিন্তু গানের প্রথাগত তালিম তাঁর খুব একটা ছিল না। ব্যান্ডের হয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন, আর সেখান থেকেই তাঁর কণ্ঠের মিষ্টতা সহকর্মীদের নজর কাড়ে।
যখন ‘ইন্ডিয়ান আইডল’-এর অডিশন শুরু হয়, প্রশান্তের সহকর্মীরাই তাঁকে জোর করে অডিশন দিতে পাঠান। অডিশন দিতে যাওয়ার জন্য তাঁর কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না বলে শোনা যায়, সেই সময় কলকাতা পুলিশের সহকর্মীরাই চাঁদা তুলে তাঁকে মুম্বই পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। অডিশনে তাঁর সরলতা এবং পাহাড়ি সুরের জাদু বিচারকদের মন জয় করে নেয়।
ইন্ডিয়ান আইডলের মূল পর্বে পৌঁছানোর পর প্রশান্তের জন্য পাহাড়ের মানুষের মধ্যে যে আবেগ তৈরি হয়েছিল, তা ভারতীয় রিয়েলিটি শোর ইতিহাসে বিরল। দার্জিলিং, সিকিম এবং নেপালের মানুষ নিজেদের ঘরের ছেলেকে জেতাতে একজোট হন। সেই সময় স্লোগান উঠেছিল— “পুলিশ নয়, প্রশান্ত আমাদের হিরো”। তাঁর জন্য কয়েক লক্ষ এসএমএস (SMS) ভোট আসত প্রতিটি পর্বে।
২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ‘ইন্ডিয়ান আইডল ৩’-এর ফাইনালে যখন প্রশান্তের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন কেবল মুম্বইয়ের স্টুডিও নয়, উল্লাসে ফেটে পড়েছিল গোটা বাংলা। অমিত পলকে হারিয়ে তিনি প্রথম উত্তর-পূর্ব ভারতের বিজয়ী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকেও তাঁকে রাজকীয় সম্মান দেওয়া হয়েছিল।
জয়ের পর প্রশান্তকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। সনি বিএমজি-র সঙ্গে তাঁর অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি নেপালি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। ‘গোর্খা পল্টন’-এর মতো সুপারহিট সিনেমা এবং পাতাল লোক ২ সিরিজে অভিনেতা হিসেবেও নিজের জায়গা করে নেন। তাঁর এই উত্থান প্রমাণ করেছিল যে, সদিচ্ছা আর মানুষের ভালোবাসা থাকলে সাধারণ এক পুলিশ কর্মীও গোটা বিশ্বের কাছে আইকন হয়ে উঠতে পারেন।
