সল্টলেকে কলসেন্টারের টিম লিডার থেকে মহিলা পর্নস্টার, শ্যামবাজারের মেয়ের তাক লাগানো গল্প

সাধারণ এক কর্মী থেকে সুচরিতা নিজের মেধা আর পরিশ্রমে হয়েছিলেন কলসেন্টারের ‘টিম লিডার’। ছোটবেলা থেকে চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চলত নাচের মহড়া, কোনওদিন বা গলায় ধরা দিত প্রিয় গানের সুর। যাত্রা আর থিয়েটারের মঞ্চে যখন অভিনয় করতেন, বুকের গভীরে সুপ্ত এক আশা দানা বাঁধত— "একদিন বড় পর্দায় দেখা যাবে তো আমায়?"

সল্টলেকে কলসেন্টারের টিম লিডার থেকে মহিলা পর্নস্টার, শ্যামবাজারের মেয়ের তাক লাগানো গল্প
Image Credit source: Facebook

|

Mar 06, 2026 | 8:01 PM

সেক্টর ফাইভের কাচঘেরা কর্পোরেট বহুতল থেকে নীল দুনিয়ায়— মাঝখানের দূরত্বটা কি খুব বেশি? মধ্যবিত্তের স্বপ্ন আর পেটের খিদের লড়াই যখন সমান্তরাল রেখায় এসে দাঁড়ায়, তখন সেই দূরত্বটুকু মুছে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের বাস বা অটো থেকে যখন ভিড়ের স্রোত নামে, তখন আইডেন্টিটি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে আর পাঁচটা মেয়ের মতোই দ্রুতপায়ে নিজের অফিসের দিকে এগিয়ে যেতেন সুচরিতা ভট্টাচার্য (নাহ, নাম অপরিবর্তি নয়)। কারণ তিনি নিজে সর্ব সমক্ষে এসে নিজের জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন।

সাধারণ এক কর্মী থেকে সুচরিতা নিজের মেধা আর পরিশ্রমে হয়েছিলেন কলসেন্টারের ‘টিম লিডার’। ছোটবেলা থেকে চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চলত নাচের মহড়া, কোনওদিন বা গলায় ধরা দিত প্রিয় গানের সুর। যাত্রা আর থিয়েটারের মঞ্চে যখন অভিনয় করতেন, বুকের গভীরে সুপ্ত এক আশা দানা বাঁধত— “একদিন বড় পর্দায় দেখা যাবে তো আমায়?”

সেই স্বপ্ন নিয়েই নিজের ছন্দে এগিয়ে চলছিল সুচরিতার জীবন। অন্য পাঁচটা মেয়ের মতো প্রেম এসেছিল তাঁর জীবনেও, সাতপাকে বাঁধাও পড়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের আয়ু ছিল মাত্র ছয় মাস। ভাঙাচোরা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে সুচরিতা যখন বাপের বাড়ির চৌকাঠে এসে দাঁড়ালেন, ভেবেছিলেন হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নিয়তি বোধহয় অলক্ষ্যে হাসছিল। করোনাকালের সেই অভিশপ্ত আবহে সুচরিতার জীবন এক লহমায় ধূসর হয়ে গেল। মহামারীর সেই দিনগুলোতে তিনি এমন এক হাতছানিতে সাড়া দিলেন, যা তাঁর সংসারের হাল তো ধরল, কিন্তু দাঁড় করিয়ে দিল এক সম্পুর্ণ অন্য দুনিয়ার দোরগোড়ায়। যা সমাজের চোখে অশ্লীল, যা কেবল অন্ধকার ঘরে মোবাইল স্ক্রিনের ব্রাউসারে স্থান পায়। সুচরিতাও স্থান পেলেন হাজারো পুরুষের ফ্যান্টাসিতে, আর নীল নিয়ন আলোর আড়ালে হারিয়ে গেল এক লড়াকু মধ্যবিত্ত মেয়ের অন্যভাবে বাঁচার লড়াই।

সুচরিতা পড়াশোনার পাশাপাশি থিয়েটার আর যাত্রার মঞ্চে নিজের অভিনয় ক্ষমতাকে শাণিত করছিলেন। ঠিক সেই সময় দাদার যোগাযোগে সেক্টর ফাইভে দেশের নামকরা টেলিকম ব্র্যান্ডের কলসেন্টারে চাকরি পান। কাজে অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় খুব দ্রুত পদোন্নতি ঘটে, টেলিকলার থেকে হয়ে ওঠেন টিম লিডার। কর্মক্ষেত্রে সাফল্য আর ব্যক্তিগত জীবনে দু’বছরের প্রেমের পর বিয়ে— সবটাই যেন ছিল রূপকথার মতো। কিন্তু বিয়ের ছয় মাস কাটতেই সেই তাল কাটল। তবে সুচরিতা এসবের জন্য কাউকে দোষ দেন না, বরং নিজের কপালকেই বিঁধিয়ে বলেন, ‘এসব বিয়ে-সংসার আমার জন্য নয়’।

সুচরিতা তখনও টের পাননি তাঁর জীবনে কী ঝড় উঠতে চলেছে। ২০২০ সাল, ঘোর করোনাকাল। ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে গিয়ে শ্যামবাজারের রাস্তায় হঠাৎই মাথা ঘুরে পড়ে যান সুচরিতার বাবা। দাদার ফোনে খবর পেয়ে হাসপাতালে দৌড়াতে হয়। একদিকে হাসপাতালের পাহাড়প্রমাণ বিল, অন্যদিকে থিয়েটার-যাত্রা-চাকরি সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেরুদণ্ডটা যখন মড়মড় করে ভাঙছে, তখন জমানো পুঁজিও শূন্য। বাবার ওষুধের খরচটুকু জোটানোর ক্ষমতা ছিল না হাতে। ঠিক সেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মুহূর্তে এল ‘বোল্ড শ্যুট’-এর অফার। শর্ত একটাই— ‘টপলেস’ হতে হবে। এই হাতছানিকে সুচরিতা ভালো করেই চেনেন। কেননা, এক সময়, এই হাতছানিকেই ‘অশ্লীল’ ভেবে দূরে ঠেলেছিলেন। কিন্তু এবারটি আর তা করতে পারলে না। চরম অসহায়তায় সেই নীল দুনিয়ার কাছেই আত্মসমর্পণ করলেন সুচরিতা। ফলও পেলেন তিনি। বোল্ড অ্যাপের সেই হাতছানিতে সাড়া দিতেই অ্যাকাউন্টে ঢুকল ৩০ হাজার টাকা। সেই টাকা সেদিন অভাবের সংসারে ছিল অক্সিজেনের মতো। সমাজ কী বলবে, লোকলজ্জা— সব তত্ত্বকথাকে একপাশে সরিয়ে রেখে সুচরিতা ঝাঁপ দিলেন এক অজানা অন্ধকারে। লক্ষ্য একটাই— বাবাকে বাঁচাতে হবে, পরিবারকে বাঁচাতে হবে।

আজ সুচরিতা অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন। ঝড় কাটিয়ে উত্তর কলকাতা ছেড়ে এখন দক্ষিণ কলকাতার পরিপাটি ফ্ল্যাটে মা-বাবাকে নিয়ে সাজিয়েছেন নতুন সংসার। অভাব মিটেছে ঠিকই, কিন্তু অভিনেত্রী হওয়ার সেই পুরনো স্বপ্নের কথা উঠলে এখন তেতো হাসিতে ফেটে পড়েন তিনি। তাঁর সপাট বয়ান, “টলিউড ইন্ডাস্ট্রির থেকে এই পর্ন ইন্ডাস্ট্রি অনেক ভালো। এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই, সবাইকে সম্মান করে। অনেক বেশি ভদ্র। ” আর ব্যক্তিগত জীবন ও বিয়ে? সুচরিতার বিন্দাস উত্তর, ”অন্যের স্বামীদের নিয়ে দিব্যি রয়েছি, নিজের স্বামী রাখার কী দরকার!”

 

একটি পডকাস্টে ক্যামেরার সামনে নিজেই নিজের জীবনের গল্প খোলামেলাভাবে তুলে ধরলেন সুচরিতা ভট্টাচার্য।