Nana Patekar: ‘আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে…’ থামল সিংহগর্জন, চিরঘুমে নানা পাটেকর

Nana Patekar Obituary: পর্দার ওপারে যে মানুষটার একটা হুঙ্কারে হল জুড়ে পিন পড়লে শব্দ শোনা যেত, বাস্তবের মৃত্যুর কাছে তিনি আজ বড়ই শান্ত। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ায় আচমকা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৭৫ বছর বয়সে চিরঘুমে পাড়ি দিলেন পদ্মশ্রী নানা পাটেকর। ডোনা পাওলার হাসপাতালে যাওয়ার পথেই ঠিক কী ঘটেছিল? জেব্রা ক্রসিং আঁকা থেকে দাপুটে অভিনেতা এবং কৃষকদের ত্রাতা হয়ে ওঠা, কেমন ছিল 'ক্রান্তিবীর'-এর জীবনের এই দীর্ঘ অজানা লড়াই? ফিরে দেখা।

Nana Patekar: আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে... থামল সিংহগর্জন,  চিরঘুমে নানা পাটেকর
প্রয়াত নানা পাটেকর

Oct 08, 2026 | 8:27 AM

পর্দায় ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। চারপাশে থিকথিক করছে ভিড়। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও লোকটার চোখেমুখে কোনও ভয় নেই। উলটে গলার শিরা ফুলিয়ে, তাচ্ছিল্যের হাসিতে ছুড়ে দিচ্ছে এক অমোঘ সংলাপ— “আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে…”। পর্দায় তাঁর এই একটা হুঙ্কারে গোটা সিনেমা হলে পিন পড়লে শব্দ শোনা যেত। রাগে লাল হওয়া চোখ আর বিদ্রোহী মেজাজে তিনি ছিলেন অনবদ্য। মৃত্যুর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সেই গর্জন আজও মানুষের গায়ে কাঁটা দেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবারের সকালটা আর নতুন করে কোনও সংলাপের সুযোগ দিল না। বাস্তবের মৃত্যুটা এল একেবারে নিঃশব্দে। গোয়ার শান্ত পরিবেশ। ভোরের আলো সবে ফুটছে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ৫টা ২০ মিনিট। হঠাৎই বুকে তীব্র যন্ত্রণা। তড়িঘড়ি ডোনা পাওলার এক বেসরকারি হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু পথেই সব শেষ। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল বলিউডের সেই চেনা গর্জন। মাত্র ৭৫ বছর বয়সেই চিরঘুমে পাড়ি দিলেন নটসম্রাট নানা পাটেকর। যাঁর অভিনয় দেখে বারবার কেঁদেছে, হেসেছে দর্শক, আজ তাঁর আচমকা চলে যাওয়ার খবরে গোটা বিনোদন জগৎ নিস্তব্ধ। আপাতত গোয়া থেকে তাঁর মরদেহ মুম্বই নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে।

গল্পটা শুরু হয়েছিল মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায়। বাবা নাম রেখেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। কিন্তু দুনিয়া তাঁকে চিনল ‘নানা’ নামে। মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি বিজয়া মেহতার হাত ধরে তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি। তবে এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের পেছনের রাস্তাটা মোটেই মসৃণ ছিল না। চরম দারিদ্র্য। জে জে স্কুল অফ আর্টসে পড়ার সময় পেটের দায়ে মুম্বইয়ের রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেছেন। সিনেমার পোস্টার এঁকে দিন চালিয়েছেন। আঘাত এসেছে ব্যক্তিগত জীবনেও। মাত্র ২৮ বছর বয়সে বাবাকে হারান। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে, যখন নিজের চোখের সামনে দেখেন দু’বছরের আদরের সন্তান দুর্বাসার মৃত্যু। একটা বাবার কাছে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে! স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরের সঙ্গে দাম্পত্যে পরবর্তীকালে দূরত্ব তৈরি হলেও, আজীবন তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান অটুট ছিল। এত শোক, এত কান্না বুকে চেপেও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের ভেতরের সবটুকু যন্ত্রণা ঢেলে দিয়েছিলেন অভিনয়ের পর্দায়। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবি দিয়ে শুরু। তারপর আর তাঁকে কখনও পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

১৯৮৯ সাল। ‘পরিন্দা’ ছবির আন্না শেঠ চরিত্র তাঁকে রাতারাতি তারকা বানিয়ে দিল। হাতে আসে প্রথম জাতীয় পুরস্কার। এরপর ১৯৯৪ সালে ‘ক্রান্তিবীর’ আর ১৯৯৭ সালে ‘অগ্নিসাক্ষী’—দুটি ছবির জন্যই তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। ‘খামোশি’-তে সলমন খান ও মনীষা কৈরালার সঙ্গে এক বধির বাবার চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও মানুষের চোখে জল আনে। মুখের কোনও কথা ছাড়াই শুধু চোখ দিয়ে যে অত সুন্দর অভিনয় করা যায়, তা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। আবার ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে ডন উদয় শেট্টির চরিত্রে তাঁর কমেডি দেখলে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। মারাঠি ছবি ‘নটসম্রাট’-এ তাঁর অনবদ্য অভিনয় সিনেমা জগতে এক মাইলফলক। কাজের প্রতি তাঁর প্যাশন এতটাই ছিল যে, ‘প্রহার’ ছবির জন্য তিন বছর সেনার কঠিন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় দেশের জন্য ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি’-তে মেজর হিসেবে কাজও করেছিলেন এই কিংবদন্তি। ভারতীয় সিনেমায় তাঁর এই বিপুল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানীয় ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

তবে কোটি টাকার মালিক হয়েও, তিনি থাকতেন একেবারে মাটির কাছাকাছি। বিলাসবহুল জীবন, দামি গাড়ি, কোনও কিছুরই মোহ তাঁকে কখনও ছুঁতে পারেনি। মুম্বইয়ের আন্ধেরিতে মাত্র এক কামরার ফ্ল্যাটে (1BHK) সাধারণ মানুষের মতো জীবন কাটিয়েছেন। দীর্ঘকাল নিজের বৃদ্ধা মায়ের সঙ্গেই কাটাতেন। মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের সাহায্যে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছিলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। কৃষকদের বিধবা স্ত্রীদের হাতে নিজের রোজগারের সিংহভাগ তুলে দিয়েছেন হাসিমুখে। ক্যামেরার সামনের নানা পাটেকরের চেয়ে, ক্যামেরার পেছনের মানুষটা ছিলেন অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি খাঁটি।

সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে হয়তো তাঁর অসংখ্য ভিডিয়ো আর দাপুটে সংলাপ ঘুরে বেড়াবে, কিন্তু রূপোলি পর্দায় নতুন করে আর কেউ ওই চেনা মেজাজে গর্জন করে উঠবে না। বিনোদন জগতের আকাশে যে গভীর শূন্যতা তিনি রেখে গেলেন, তা বোধহয় কোনও দিনই পূরণ হওয়ার নয়। নশ্বর শরীরটা তিনি আজ ছেড়ে গিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর অনবদ্য কাজ আর মানবদরদী সত্তার মধ্যে দিয়ে। সেলুলয়েডের পাতা থেকে নেমে আসা বাস্তবের এক সত্যিকারের হিরোর আজ চিরবিদায়। ভালো থাকবেন, ক্রান্তিবীর! বিদায়, নটসম্রাট!

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us