
বলা হয়, ছবিতে তাঁর চোখের জল আনার জন্য কখনও গ্লিসারিনের প্রয়োজন পড়েনি। তিনি যখন ক্যামেরার সামনে কাঁদতেন, তখন আসলে চরিত্রের চেয়েও বেশি কাঁদত তাঁর নিজের ক্ষতবিক্ষত আত্মা। বলিউডের ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ মীনাকুমারী (Meena Kumari)। যাঁর জীবন ছিল এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের পাণ্ডুলিপি। সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়েও তিনি ছিলেন একদম একা। যাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের গল্প শুনলে শিউরে ওঠেন অনেকেই।
মীনাকুমারীর যখন জন্ম হয়, তখন নাম ছিল মেহজাবিন বানো। অভাবের তাড়না এতটাই ছিল যে, বাবা আলি বক্স সদ্যোজাত কন্যাকে এক অনাথ আশ্রমের বাইরে ফেলে দিয়ে এসেছিলেন। তবে কিছুক্ষণ পরেই বাবার মন ডুকরে ওঠে, তিনি আবার ফিরে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নেন। সেই থেকেই শুরু। মাত্র ৯ বছর বয়সেই সংসারের অন্ন জোগাতে নামতে হয়েছিল অভিনয় জগতে। ১৯৫০ এবং ৬০-এর দশকে তিনি যখন ‘বাইজু বাওরা’ বা ‘সাহিব বিবি অউর গুলাম’-এর মাধ্যমে কোটি মানুষের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন, তখন কেউ জানত না এই গ্ল্যামারের আড়ালে অভিনেত্রীর জীবন কতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে মীনাকুমারী প্রেমে পড়েন পরিচালক কমল আমরোহির। ১৯৫২ সালে গোপনে বিয়েও করেন। কিন্তু সেই প্রেমই কাল হয়ে দাঁড়াল। কমল ছিলেন অসম্ভব রক্ষণশীল। বলিউডের এক নম্বর নায়িকার মেকআপ রুমে বাইরের কারও ঢোকা ছিল নিষিদ্ধ, কাজ শেষ করে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাড়ি ফেরা ছিল বাধ্যতামূলক। নিজের উপার্জিত অর্থে গোটা দুনিয়া কেনার ক্ষমতা থাকলেও মীনাকুমারী নিজের বাড়িতেই ছিলেন বন্দিনী।
স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর অনিদ্রার হাত থেকে বাঁচতে চিকিৎসকের পরামর্শে দু’পেগ ব্র্যান্ডি নেওয়া শুরু করেন মীনাকুমারী। কিন্তু সেই সামান্য ওষুধ থেকেই তিনি মাদকাসক্ত হয় পড়েন। শরীরের অবস্থা তখন শোচনীয়, লিভার সিরোসিসে রক্তশূন্য অবস্থা। এদিকে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে আটকে থাকা কমল আমরোহির স্বপ্ন ‘পাকেজাহ’ (Pakeezah) ছবির কাজ তখনও বাকি। অসুস্থ শরীর নিয়েই মীনাকুমারী সেই ছবির শুটিং শেষ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছবির প্রিমিয়ারে বসে তিনি নিজে কেঁদে ফেলেছিলেন নিজের সৌন্দর্য দেখে— কারণ তিনি জানতেন, তাঁর জীবন এগোচ্ছে শেষের পথে।
ছবির মুক্তির মাত্র ২৮ দিন পর, ৩১ মার্চ ১৯৭২ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মীনাকুমারীর হৃদস্পন্দন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যে অভিনেত্রী একাই গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে এককালে টেনেছেন, তাঁর মরদেহ হাসপাতাল থেকে ছাড়ানোর জন্য কেউ এগিয়ে আসেন নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর চিকিৎসক নিজের পকেট থেকে বিল মিটিয়ে মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেদিন পাশে ছিলেন না কমল আমরোহি। অথচ অদ্ভুত ভাবে ১৯৯৩ সালে মৃত্যুর আগে কমল ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন মীনাকুমারীর পাশেই যেন তাঁকে সমাহিত করা হয়।