
মুম্বই: আজ ঘরে ঘরে রিলায়েন্স জিয়োর গ্রাহক। তবে এই জিয়োর ভাবনা এসেছিল কোথা থেকে জানেন? কলেজের একটা অ্যাসাইনমেন্ট অনলাইনে জমা দিতে গিয়ে ইন্টারনেটের সমস্যায় পড়েছিলেন ইশা অম্বানী। আর সেই ঘটনাই পরবর্তীকালে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের টেলিকম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবসা জিয়ো (Jio) তৈরির ভাবনা তৈরি করে। সম্প্রতি জিয়ো প্ল্যাটফর্ম (Jio Platforms)-এর আসন্ন আইপিও (IPO) নিয়ে একটি আলোচনায় যোগ দিয়ে এই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মুকেশ অম্বানীর কন্যা তথা রিলায়েন্সের নন-এগজেকিউটিভ ডিরেক্টর ইশা অম্বানী।
ইশা জানান, ২০০৯-২০১০ সালের দিকে এই ঘটনার সূত্রপাত। তখন তিনি এবং তাঁর ভাই আকাশ অম্বানী আমেরিকায় পড়াশোনা করতেন। ছুটিতে তাঁরা মুম্বইয়ে ফিরেছিলেন। সেই সময় একটি অ্যাসাইনমেন্ট অনলাইনে জমা দেওয়ার চেষ্টা করেন ইশা। কিন্তু ইন্টারনেট কাজ না করায় তিনি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে পারেননি।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামো নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আমেরিকায় যে ধরনের উন্নত ইন্টারনেট পরিষেবা তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন, ভারতের ক্ষেত্রে সেই সুবিধার অভাব কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে।
ইশা জানান, এরপর তাঁদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়, ভারত কেন পিছিয়ে থাকবে? সেই সময় আকাশ অম্বানী মনে করেছিলেন, এই সমস্যার সমাধান করতে হলে এমন একটি ডিজিটাল প্রযুক্তি সংস্থা তৈরি করতে হবে, যা দেশের ইন্টারনেট সংযোগের ঘাটতি দূর করতে পারবে। একই সঙ্গে আরও বেশি ভারতীয়কে ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হওয়ার সুযোগ করে দেবে।
২০০৯-২০১০ সালে এই ভাবনার সূত্রপাত হলেও জিয়োর পরিষেবা চালু হয় ২০১৬ সালে। অর্থাৎ প্রাথমিক আলোচনা থেকে বাস্তবে পরিষেবা চালু হতে কয়েক বছর সময় লেগেছিল। এক দশকের মধ্যে জিয়ো রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের টেলিকম ও ডিজিটাল ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
রিলায়েন্সের ব্যবসা গড়ে তোলার পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইশা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। ইশা জানান, রিলায়েন্সে তারা কিছুই আজ বা আগামিকালের জন্য তৈরি করেন না। বরং কয়েক দশক এগিয়ে ভাবনাচিন্তা করা হয়। আগামী কয়েক দশকে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং ভবিষ্যতে কী প্রয়োজন হবে, তা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নির্মাণ, বিনিয়োগ, অর্থ উপার্জন ও পুনর্বিনিয়োগ- এটাই রিলায়েন্সের চক্র। তিনি বলেন, “রিলায়েন্সের প্রতিশ্রুতি হল প্রত্যেক ভারতীয়কে তাদের সাফল্যের কাহিনির অংশ করে তোলা।”
জিয়োর বহু প্রতীক্ষিত আইপিও নিয়ে ক্রমশ্য আগ্রহ বাড়ছে। এই শেয়ার বাজারে আসার প্রস্তাবিত উদ্যোগকে ভারতের অন্যতম বড় পাবলিক অফারিং হিসাবে দেখা হচ্ছে। এই আইপিও (IPO)-র জন্য শেয়ার প্রতি ১,০৬৫ টাকা থেকে ১,১১৯ টাকা পর্যন্ত প্রাইস ব্যান্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ইস্যুর পরিমাণ ৩০,২১৩ কোটি টাকা। আইপিও-র জন্য সাবস্ক্রিপশন শুরু হওয়ার কথা আগামী ২১ অক্টোবর থেকে। তা চলবে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত।
এই আলোচনাতেই রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই অম্বানীকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান নাতনি ইশা অম্বানী। ধীরুভাইয়ের স্বপ্ন, তাঁর দূরদর্শিতা এবং দেশের উন্নয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ভাবনাকে তুলে ধরেন। ইশার কথায়, রিলায়েন্স শুধু একটি সংস্থা নয়, বরং এমন একটি প্রতিশ্রুতি, যেখানে প্রত্যেক ভারতীয় দেশের উন্নতির অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন।
১৯৭৭ সালে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজকে শেয়ারবাজারে নিয়ে এসেছিলেন ধীরুভাই আম্বানি। প্রায় ৫০ বছর আগের সেই পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে ইশা জানিয়েছেন, তারপর থেকে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক গড় রিটার্নের হার ২৯ শতাংশ।
দাদুকে স্মরণ করে ইশা বলেন, “ওঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে। ধীরুভাইয়ের কাছে রিলায়েন্স কেবল একটি সংস্থা ছিল না। তাঁর কাছে এটি ছিল এমন একটি প্রতিশ্রুতি, যার মাধ্যমে প্রত্যেক ভারতীয় দেশের উন্নতিতে অংশ নিতে পারবেন, দেশের সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে পারবেন এবং আরও ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারবেন।”
ইশা আরও জানান, ধীরুভাই আম্বানি ফুটবল স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষের সামনে বক্তব্য রাখতেন। তাঁর ভাবনা ও বক্তব্য হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করত। তিনি এমন এক ভারতের স্বপ্ন দেখতেন, যে দেশ আরও শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী এবং সমৃদ্ধ হবে। ধীরুভাইয়ের এই বার্তা ছিল সহজ, কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর মতে, বড় স্বপ্ন দেখতে হবে, নির্ভীক হতে হবে, বড় করে ভাবতে হবে এবং নিরন্তর নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎকর্ষের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে।
ইশার বক্তব্য অনুযায়ী, তিন প্রজন্ম পেরিয়ে গেলেও তাঁরা এখনও তাঁদের মূল মন্ত্র ‘গ্রোথ ইজ লাইফ’ (Growth Is Life)-এর প্রতি সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ। অর্থাৎ, উন্নতিই জীবন। এই মন্ত্রকে সামনে রেখেই তাঁরা ধীরুভাই অম্বানীর স্বপ্ন ও ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।