‘যৌনাঙ্গে বীর্যের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে না যে যৌন নির্যাতন হয়নি’, সৎ বাবার যাবজ্জীবন সাজাই বহাল রাখল হাইকোর্ট

Madras High Court: হাইকোর্ট উল্লেখ করে, ঘটনার পর নির্যাতিতা প্রথমবার মায়ের কাছে যা জানিয়েছিল, চিকিৎসকের কাছে দেওয়া বক্তব্য, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া ১৬৪(৫) ধারায় বয়ান এবং ট্রায়াল কোর্টে দেওয়া সাক্ষ্য—সব ক্ষেত্রেই শিশুটির বক্তব্যে সামঞ্জস্য ছিল। আদালতের বক্তব্য, শিশুটির বয়ান বিশ্বাসযোগ্য এবং তা নিয়ে সন্দেহের কোনও কারণ নেই।

যৌনাঙ্গে বীর্যের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে না যে যৌন নির্যাতন হয়নি, সৎ বাবার যাবজ্জীবন সাজাই বহাল রাখল হাইকোর্ট
প্রতীকী চিত্র।Image Credit source: Pexels

|

Sep 26, 2026 | 4:07 PM

চেন্নাই: শিশুর শরীরে যৌনাঙ্গে কোনও আঘাত না থাকা, বীর্য বা শুক্রাণুর নমুনা না পাওয়া কিংবা সতীপর্দা (Hymen) অক্ষত থাকা—এগুলি কোনওটিই প্রমাণ করে না যে যৌন নির্যাতন ঘটেনি। নাবালিকা মেয়েকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে সৎ বাবার যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখল মাদ্রাজ হাইকোর্ট।

মাদ্রাজ হাইকোর্টে বিচারপতি এ ডি জগদীশ চন্দিরা এবং বিচারপতি বি মুরুগেশনের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, পকসো (POCSO) আইনে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আইনের ৩ নম্বর ধারায় মূলত অভিযুক্তের কী ধরনের যৌন আচরণ ছিল, তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিশুর শরীরে দৃশ্যমান আঘাত থাকতেই হবে—আইনে এমন কোনও শর্ত নেই।

কী ঘটেছিল?

ঘটনাটি ২০২০ সালের ১ অক্টোবরের। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন ১০ বছরের নাবালিকার মা কাজে গিয়েছিলেন। বাড়িতে তখন ছিল অভিযুক্ত সৎ বাবা এবং মেয়েটি। অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তি নাবালিকার এক আত্মীয়কে কোনও কাজের অজুহাতে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এরপর সৎ মেয়েকে একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে যৌন নির্যাতন করে।

কিছুক্ষণ পর ওই আত্মীয় বাড়িতে ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ দেখতে পায়। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে সে অভিযুক্তকে নাবালিকার গায়ের উপর নগ্ন অবস্থায় দেখতে পায় বলে অভিযোগ। এরপর সে এক প্রতিবেশীকে বিষয়টি জানায়। প্রতিবেশী নাবালিকার মাকে খবর দেন।

পরে নাবালিকা তাঁর মা এবং অন্যদের কাছে পুরো ঘটনা জানায়। সে আরও অভিযোগ করে, এর আগেও অভিযুক্ত তাঁকে তিনবার যৌন নির্যাতন করেছিল। বিষয়টি কাউকে জানালে তাঁকে এবং তাঁর মাকে খুন করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে নির্যাতিতার দাবি।

মামলায় অভিযুক্তের দাবি ছিল, মেডিক্যাল রিপোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণ করে না। নাবালিকার যৌনাঙ্গের আশপাশে কোনও আঘাত পাওয়া যায়নি। কোনও শুক্রাণুও মেলেনি এবং তাঁর হাইমেন বা সতীপর্দাও অক্ষত ছিল।

নাবালিকার বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি ছিল, নাবালিকা শেখানো কথা বলতে পারে। সাক্ষীদের বক্তব্যেও অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া পকসো (POCSO) আইনের ২৯ নম্বর ধারায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যে আইনি পদক্ষেপ প্রযোজ্য, তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণও মামলায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে দাবি করা হয়।

আদালত কী বলল?

মাদ্রাজ হাইকোর্ট জানায়, শিশুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ মিথ্যা হয়ে যায় না। এমনকী, বীর্য বা শুক্রাণু না পাওয়া কিংবা হাইমেন অক্ষত থাকাও যৌন নির্যাতন হয়নি- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আদালত সুপ্রিম কোর্টের দীনেশ কুমার জলধারি বনাম ছত্তীসগঢ় (Dinesh Kumar Jaldhari v. State of Chhattisgarh) মামলার রায়ের কথাও উল্লেখ করে। আদালত জানায়, কোনও মামলায় প্রত্যক্ষ বা সাক্ষ্যপ্রমাণ যদি  বিশ্বাসযোগ্য হয়, তাহলে শুধু মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রমাণের ভিত্তিতে সেই সাক্ষ্যকে খারিজ করা যায় না।

আদালতের বক্তব্য, পকসো আইনের ৩ নম্বর ধারায় যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞায় শারীরিক আঘাতকে অপরাধের আবশ্যিক শর্ত করা হয়নি। তাই শিশুর শরীরে দৃশ্যমান আঘাত না থাকাকে, যৌন নির্যাতন না হওয়ার প্রমাণ হিসাবে ধরা যাবে না।

নির্যাতিতার বক্তব্যে ভরসা

মাদ্রাজ হাইকোর্ট উল্লেখ করে, ঘটনার পর নির্যাতিতা প্রথমবার মায়ের কাছে যা জানিয়েছিল, চিকিৎসকের কাছে দেওয়া বক্তব্য, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া ১৬৪(৫) ধারায় বয়ান এবং ট্রায়াল কোর্টে দেওয়া সাক্ষ্য—সব ক্ষেত্রেই শিশুটির বক্তব্যে সামঞ্জস্য ছিল। আদালতের বক্তব্য, শিশুটির বয়ান বিশ্বাসযোগ্য এবং তা নিয়ে সন্দেহের কোনও কারণ নেই। এই বক্তব্যকে সমর্থন করার জন্য অতিরিক্ত প্রমাণেরও প্রয়োজন নেই। জানালা দিয়ে ঘটনাটি দেখেছিল বলে দাবি করা শিশুটির আত্মীয়ের বক্তব্যও আদালত বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছে। জেরার সময়ও তাঁর বক্তব্যে কোনও বড় অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি।

আদালত আরও জানায়, ঘটনার সময় শিশুটির বয়স ১২ বছরের কম ছিল এবং অভিযুক্ত তাঁর সৎ বাবা। এছাড়া এর আগেও একাধিকবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। ফলে পকসো আইনের ৫(এল), ৫(এম) এবং ৫(এন) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ প্রমাণিত হয়।

সব দিক বিবেচনা করে মাদ্রাজ হাইকোর্ট অভিযুক্তের আবেদন খারিজ করে দেয়। একই সঙ্গে বিশেষ পকসো আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে আদালত। যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি অপরাধমূলক হুমকির অভিযোগে দেওয়া সাজাও বহাল রাখা হয়েছে।

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us