
নয়া দিল্লি: বাংলাদেশে যেমন গণআন্দোলনের নামে সরকারকে গদিচ্যুত করা হয়েছিল, সেই পরিকল্পনাই কি এই দেশের মাটিতে করা হচ্ছে? এই ধারণা অমূলক নয়। দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে সমর্থন জানাল বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম মুখ তথা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)-র প্রতিষ্ঠাতা নাহিদ ইসলাম। কী বলছেন বাংলাদেশি নেতা?
জাতীয় নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে গতকাল পথে নেমেছিল ককরোচ জনতা পার্টি। যন্তর মন্তরে তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। তবে যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর আগেই আন্দোলনকারীদের আটকে দেয় পুলিশ। ব্যাপক ধস্তাধস্তি, ধরপাকড় হয়। কমপক্ষে তিন হাজার জনকে আটক করা হয়। পরে সকলকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। আজ আবার আন্দোলনের ডাক দিয়েছে সিজেপি।
সিজেপির এই আন্দোলন নিয়ে যখন দেশের অন্দরে দুশ্চিন্তা, তখনই বাংলাদেশ কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখ নাহিদ ইসলাম পাশে দাঁড়াল সিজেপির। দীর্ঘ একটি পোস্ট করে সিজেপিকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন নাহিদ। তিনি লেখেন, ” নির্বাচনী ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করা ভারতের তরুণ-তরুণীদের পাশে আমরা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি। নয়া দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী, আন্দোলনের সংগঠক এবং সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং যন্তর মন্তরে বিধিনিষেধ জারি করার মতো ঘটনাগুলি মানুষের মৌলিক স্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত হানছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব স্বচ্ছভাবে দেওয়া দরকার। ব্যারিকেড তৈরি করে বা সংবাদপ্রকাশে বাধা দিয়ে সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।”
নাহিদ আরও লেখেন, “এই লড়াই শুধু আপনাদের একার নয়। ঢাকা থেকে আমরা আপনাদের পাশে রয়েছি। জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আমরা একে অপরের বন্ধু ও সহযোদ্ধা।”
শেখ হাসিনাকে গদিচ্যুত করেছিল যে আন্দোলন, সেই প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ বলেন, “এই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আমাদেরও রয়েছে। কারণ, আমরা নিজেরাও এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদের ছাত্র আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশজুড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। সেই আন্দোলন দমন করতে রাষ্ট্রের তরফে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব অনুযায়ী, সেই গণঅভ্যুত্থান এবং তা দমন করার সময় সর্বোচ্চ ১,৪০০ জনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের সেই আন্দোলনের সময় ভারতের ছাত্রছাত্রী, লেখক এবং স্বাধীন কণ্ঠস্বরের মানুষজন যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আমরা তাঁদের সংহতি ও সমর্থন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।”
STATEMENT OF SOLIDARITY WITH THE YOUTH OF INDIA
Dhaka, Bangladesh | 10 October 2026
To the youth and democratic forces of India,
We stand in firm solidarity with the young people of India demanding electoral accountability and defending their democratic rights. Recent detentions of peaceful protesters, organizers, and journalists in New Delhi, alongside internet suspensions and restrictions at Jantar Mantar, directly threaten fundamental freedoms. Concerns regarding electoral integrity and institutional independence require transparent answers, not barricades and censorship.
This struggle is not yours alone. From Dhaka, we stand with you as friends bound by a common demand for accountable power, democratic institutions, and human dignity.
We know this struggle intimately, because we have lived it. In July 2024, our student led movement against recruitment quotas transformed into a nationwide uprising against 15 years of authoritarian rule. The state responded with live ammunition. The United Nations later estimated that as many as 1,400 people were killed during the uprising and its suppression. We deeply remember and honor the solidarity shown by Indian students, writers, and independent voices during our uprising.
We recognize India’s rich traditions of democratic resistance. The women of Shaheen Bagh defended equal citizenship through a Delhi winter, while generations of students at JNU and Jadavpur University have sustained organised dissent. These remain invaluable democratic inheritances. Today, we once again see the courage of young Indian women on the streets. In Bangladesh, women were also at the forefront of the July Revolution; their courage and sacrifices helped secure our victory.
Hindutva majoritarianism, fascism, and every form of religious supremacy must not define the future of South Asia. We reject authoritarianism, communal hatred, and political intolerance in India just as we reject them in Bangladesh. Our shared future must rest on communal harmony and social justice, irrespective of religion, caste, gender, or class. No society is truly democratic while minorities live in fear, dissent is criminalized, and citizenship is conditional on identity.
We call upon Indian authorities to respect the right to peaceful assembly, disclose the whereabouts and legal grounds for detaining protest organizers, immediately release those held for exercising their rights, and ensure journalists can report without intimidation or equipment seizure.
Today, many young leaders have been unjustly detained. Sharjeel Imam and Umar Khalid continue to be kept behind bars for years without trial. We regard all of India’s young protesters and prisoners of conscience as comrades. Their courage inspires young people across South Asia.
Our struggles are interconnected, extending to unresolved issues of border killings, water sharing, environmental protection, and national sovereignty. We seek a South Asia where nations treat each other as equals, governments remain accountable, and sovereignty is never an excuse for domination.
To the democratic people of India: from Dhaka, and from the unfinished democratic aspirations of our July generation, we stand with you. Stand firm, protect one another, reject communal hatred, and refuse to surrender the future of South Asia to fascism and division.
Inqilab Zindabad.
— Nahid Islam (@NahidIslam_24) October 10, 2026
এরপর আরও লেখেন, “ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে আমরা স্বীকার করি। দিল্লির শীতের মধ্যে শাহিনবাগের মহিলারা সমান নাগরিক অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। অন্যদিকে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (JNU) এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজন্মের পর প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা সংগঠিত প্রতিবাদের ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই ঐতিহ্য ভারতের গণতন্ত্রের অমূল্য সম্পদ। আজও আমরা রাস্তায় ভারতের তরুণীদের সাহসী ভূমিকা দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশেও জুলাই বিপ্লবে মহিলারা সামনের সারিতে ছিলেন। তাঁদের সাহস এবং আত্মত্যাগই আমাদের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, ফ্যাসিবাদ এবং ধর্মীয় আধিপত্যের কোনও রূপই দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। ভারতে স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতাকে আমরা যেমন প্রত্যাখ্যান করি, তেমনই বাংলাদেশেও এই প্রবণতাগুলির বিরোধিতা করি। আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে হবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। ধর্ম, জাতপাত, লিঙ্গ বা শ্রেণি—কোনও কিছুর ভিত্তিতেই মানুষের মধ্যে বৈষম্য করা চলবে না। যে সমাজে সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ্যে থাকেন, ভিন্নমত প্রকাশ করাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয় এবং মানুষের পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকত্বের অধিকার নির্ধারিত হয়, সেই সমাজকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বলা যায় না।”
ভারত সরকারের কাছে কয়েকটি দাবিও জানান নাহিদ। বলেন, “আমরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি জানাচ্ছি। শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত ও আন্দোলন করার অধিকারকে সম্মান করতে হবে। আন্দোলনের সংগঠকদের কোথায় রাখা হয়েছে এবং কোন আইনি ভিত্তিতে তাঁদের আটক করা হয়েছে, তা প্রকাশ করতে হবে। নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করার জন্য যাঁদের আটক করা হয়েছে, তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি, সাংবাদিকরা যাতে ভয়ভীতি ছাড়াই খবর সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের হেনস্থা করা বা সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করা বন্ধ করতে হবে।”
শুধু অভিজিৎ দীপকে বা গতকালের আন্দোলনকারীরাই নয়, উমর খালিদদেরও মুক্তির দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। দীর্ঘ পোস্টে লেখেন, “আজ ভারতের বহু তরুণ আন্দোলনকারী নেতাকে অন্যায়ভাবে আটক করে রাখা হয়েছে। শার্জিল ইমাম এবং উমর খালিদও বছরের পর বছর ধরে বিচার ছাড়াই বন্দি রয়েছেন। ভারতের সমস্ত তরুণ আন্দোলনকারী এবং বিবেকের তাড়নায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বন্দি হওয়া মানুষদের আমরা নিজেদের সহযোদ্ধা বলে মনে করি। তাঁদের সাহস দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।”
দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধী নেতা লেখেন, “আমাদের লড়াই একে অপরের সঙ্গে জড়িত। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, জলবণ্টন, পরিবেশ রক্ষা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো অমীমাংসিত সমস্যাগুলিও আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। আমরা এমন একটি দক্ষিণ এশিয়া চাই, যেখানে প্রতিটি দেশ একে অপরের সঙ্গে সমান মর্যাদায় সম্পর্ক বজায় রাখবে, সরকারকে নিজেদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে কোনও দেশ অন্য দেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না।”
শেষে লেখেন, “ভারতের গণতন্ত্রকামী মানুষের উদ্দেশে আমাদের বার্তা— ঢাকা থেকে এবং আমাদের জুলাই প্রজন্মের অপূর্ণ গণতান্ত্রিক স্বপ্নের পক্ষ থেকে আমরা আপনাদের পাশে রয়েছি। দৃঢ় থাকুন, একে অপরকে রক্ষা করুন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে প্রত্যাখ্যান করুন। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎকে ফ্যাসিবাদ ও বিভাজনের হাতে ছেড়ে দেবেন না”