
নয়া দিল্লি: স্ত্রীকে ‘বোকা’ (Stupid) বা ‘অকর্মণ্য’ (Useless) বলে অপমান করলেই তা নিষ্ঠুরতা বা অপরাধ নয়। গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court)। স্ত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা খারিজ করে এমনই মন্তব্য করেছে শীর্ষ আদালত। আদালতের বক্তব্য, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ব্যবহার নিয়ে সমস্যা থাকতেই পারে। কিন্তু তার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে স্ত্রীর আত্মহত্যার জন্য দায়ী করা যায় না।
বিচারপতি বিভি নাগরত্না এবং বিচারপতি মনমোহনের বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। কানাডার টরন্টোয় স্ত্রীর আত্মহত্যার পর স্বামীর বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় বম্বে হাইকোর্টের ঔরঙ্গাবাদ বেঞ্চ স্বামীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা খারিজ করলেও স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেই নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, “অত্যন্ত মেজাজ রয়েছে এমন স্বভাবের কোনও স্বামী বা স্ত্রীর আচরণকে অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন বা গুরুতর আঘাতের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। বিশেষত, যখন সেই অভিযোগের সমর্থনে কোনও উপযুক্ত প্রমাণ নেই। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্ত্রীর আত্মহত্যার জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করার চেষ্টা আইনের অপব্যবহারের সামিল।”
২০২১ সালে ওই দম্পতির বিয়ে হয়। ২০২২ সালে তাঁরা কানাডার টরন্টোয় চলে যান। অভিযোগ, ২০২৩ সালের ১১ জুন নিজেদের আবাসনের ২২ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন ওই মহিলা। ঘটনার পর তাঁদের ফ্ল্যাট থেকে একটি হাতে লেখা নোট উদ্ধার হয়। সেখানে ওই মহিলা লিখেছিলেন, “আমি জীবনে ব্যর্থ হয়েছি। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চাকরি খুঁজেও এখনও লড়াই করছি… আমি আর বাঁচতে চাই না। তাই চলে যাচ্ছি।”
মেয়ের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, বিয়ের আগে ১৫ ভরি সোনা, বিয়ের পর প্রথম দীপাবলিতে সোনার আংটি ও ব্রেসলেট এবং ২০২২ সালে আরও তিন ভরি সোনা পণের দাবি করেছিলেন স্বামী ও তাঁর পরিবার। পাশাপাশি স্বামী তাঁর মেয়েকে নিয়মিত অপমান করতেন এবং ‘বোকা’, ‘অকর্মণ্য’ বলে সম্বোধন করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে কানাডার তদন্তকারী সংস্থার রিপোর্টে অন্য তথ্য উঠে আসে। ২০২৪ সালের টরন্টো পুলিশের ক্লোজার রিপোর্ট এবং কানাডার করোনারের তদন্তে কোনও ধস্তাধস্তি বা অস্বাভাবিক ঘটনার প্রমাণ মেলেনি। আত্মহত্যার নোটের হাতের লেখাও ওই মহিলার বলেই নিশ্চিত করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার সময় স্বামী বাড়িতে ছিলেন না।
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ২০২১ ও ২০২২ সালের পণ সংক্রান্ত অভিযোগের পর থেকে ২০২৩ সালের ১১ জুন মহিলার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পণের দাবির বিষয়ে কোনও অভিযোগ ওঠেনি। মৃত্যুর পরই প্রথম এফআইআর দায়ের করা হয়। ফলে এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের।
আত্মহত্যার আগে লেখা নোটেও স্বামী বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগের উল্লেখ ছিল না। আদালতের বক্তব্য, পণের দাবির কারণে যদি ওই মহিলা মানসিক বা শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকতেন, তাহলে সেই বিষয়টি তাঁর সুইসাইড নোটে উঠে আসার সম্ভাবনা ছিল।
বিয়ের সময় দেওয়া ১৫ ভরি সোনা নিয়েও আদালত জানায়, অভিযোগকারীর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সোনা শুধু জামাইকে নয়, মেয়েকেও দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেটিকে পণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। ভারতীয় পরিবারে বিয়ের উপহার হিসেবে এই ধরনের সোনা দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।
প্রথম দীপাবলিতে সোনার আংটি, ব্রেসলেট-সহ উপহার দেওয়ার বিষয়টিকেও আদালত পারিবারিক রীতি ও প্রথার অংশ হিসেবে দেখেছে। আদালতের মতে, দীপাবলিতে মেয়েকে উপহার দেওয়ার পাশাপাশি জামাই ও তাঁর বাবা-মাকেও উপহার দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এই উপহার আদানপ্রদানকে অপরাধের রং দেওয়া যায় না।
এছাড়া মৃতার ভাইয়ের অ্যাকাউন্ট থেকে স্বামীর অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ টাকা পাঠানোর বিষয়টিও খতিয়ে দেখে আদালত। সেই সময় ওই মহিলার ভারতে আসার বিমানের টিকিট বুক করা হয়েছিল। স্বামীর ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে একাধিক লেনদেনের তথ্যও ছিল। তাই বিচ্ছিন্নভাবে একটি লেনদেনকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না বলে জানায় আদালত।
স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে বোকা ও অকর্মণ্য বলার অভিযোগ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের মন্তব্য প্রাথমিকভাবে সত্যি বলে ধরে নিলেও তা ৪৯৮এ ধারায় নিষ্ঠুরতা বা অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। সর্বোচ্চ এটুকু বলা যেতে পারে যে, স্বামীর স্বভাবে কিছু সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তার ভিত্তিতে স্ত্রীর আত্মহত্যার জন্য তাঁকে অপরাধী করা যায় না।
আদালত আরও জানায়, শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগেও কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ নেই। শুধুমাত্র সাধারণভাবে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের অভিযোগ করলেই ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া যায় না। নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করতে হলে নির্দিষ্ট ঘটনা বা আচরণের বিবরণ থাকা প্রয়োজন।