
কলকাতা: রাজনীতিতে নজির হয়ে থাকবে বাংলার পালাবদলের পরে তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ভাঙন। বিগত ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবি হয়, ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি (BJP)। এরপরই তৃণমূল সাংসদরা পাল্টালেন রঙ। দলের বিরুদ্ধেই সুর চড়ালেন বিদ্রোহী সাংসদরা। লোকসভায় আলাদা ফ্রন্ট গড়ার কথা বললেও, রবিবার (১৪ জুন) নাটকীয় মোড় নিয়ে একটি ছোট্ট দল, ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়ায় (Nationalist Citizens Party of India) মিশে গেলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ। তবে অনেকেরই প্রশ্ন, এভাবে কি অন্য দলে মিশে যাওয়া যায়?
সংবিধান অনুযায়ী, এক দলের সাংসদরা অন্য দলে মিশে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে মানতে হবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ম।
কোনও একটি রাজনৈতিক দলের আইনসভার (এক্ষেত্রে সংসদের) মোট নির্বাচিত সদস্য বা সাংসদদের মধ্যে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য যদি অন্য কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বা মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবেই সেটি বৈধ ‘সংযুক্তিকরণ’ বা ‘মার্জার’ (Merger) হিসেবে গণ্য হবে।
যদি এই দুই-তৃতীয়াংশের শর্ত পূরণ হয়, তবে সেই সাংসদদের পদ খারিজ বা অযোগ্য (Disqualify) ঘোষণা করা যাবে না। তারা দলত্যাগ বিরোধী আইন থেকে ছাড় পাবেন।
তবে যদি দুই-তৃতীয়াংশের কম সংখ্যক সাংসদ, যেমন একজন, দুজন বা অর্ধেক সদস্য দল ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেন, তবে তাদের সাংসদ পদ সরাসরি খারিজ হয়ে যাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে উঠে এসেছে যে কেবল সংসদের ভেতরে থাকা সাংসদদের সংখ্যাই শেষ কথা নয়। আসল বা মূল রাজনৈতিক দলটি (Parent Organization) অন্য দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মূল দলের সম্মতি ছাড়া কেবল সাংসদরা নিজেদের সংখ্যা দেখিয়ে অন্য দলে মিশে গেলে, তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
যদি কোনও দলের সাংসদরা দল ভেঙে অন্য দলে যোগ দেন, তবে আসল দলটির কাছে আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ করার একাধিক রাস্তা খোলা থাকে।
দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় কোনও সাংসদের পদ খারিজ করার চাবিকাঠি থাকে সংশ্লিষ্ট কক্ষের প্রিসাইডিং অফিসার বা স্পিকারের (Speaker) হাতে। চাইলে আসল দল লোকসভা বা রাজ্যসভার স্পিকারের কাছে লিখিত আবেদন জানাতে পারেন ওই দলত্যাগী সাংসদদের পদ খারিজর আবেদন করে। আবেদনে রাজনৈতিক দল দাবি করতে পারে যে দলত্যাগ সংবিধানের দশম তফসিলের ২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংসদদের অন্য দলে মিশে যাওয়া অবৈধ এবং এটি “স্বেচ্ছায় দলের সদস্যপদ ত্যাগ করার” সামিল।
স্পিকার যদি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেন বা তাঁর সিদ্ধান্ত যদি আইনসম্মত না হয়, তবে আসল দলটি আদালতের দ্বারস্থও হতে পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের ‘কিহোতো হলোহন’ (Kihoto Hollohon) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে দলত্যাগ বিরোধী আইনে স্পিকারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলেও, তা আদালতের পর্যালোচনার (Judicial Review) ঊর্ধ্বে নয়।
স্পিকার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করলেও মূল রাজনৈতিক দলের কাছে চ্যালেঞ্জ করার পথ খোলা থাকে। এই নিয়ে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে মণিপুরের এক বিধায়কের দলত্যাগ সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়। তৎকালীন বিচারপতি আর.এফ. নরিমানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্দেশ দেয় যে দলত্যাগ বিরোধী আইনের অধীনে কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে অযোগ্যতার (Disqualification) আবেদন জমা পড়লে, স্পিকারকে অবশ্যই সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা সামান্য বাড়তে পারে।
যদি দলে বড় ভাঙন ধরে, তবে মূল বা আসল দলটি নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) দ্বারস্থ হয়ে নিজেদের দলের নাম, প্রতীক (Symbol) এবং সাংগঠনিক সত্ত্বা যাতে চুরি না হয় বা অন্য পক্ষ যাতে তা দাবি করতে না পারে, তার জন্য আইনি লড়াই লড়তে পারে। তবে এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে বিদ্রোহী শিবির দলের নাম-প্রতীক পেয়ে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে, যেমনটা মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ও এনসিপি-র সঙ্গে হয়েছে।