
ক্যানসারের ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা MRP এবং খুচরো বিক্রেতাদের কেনার দামের মধ্যে বিপুল ফারাক নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। তার পরই ওষুধের দামে নিয়ন্ত্রণ আনতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমস্ত নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধের ক্ষেত্রে ট্রেড মার্জিন সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে বেঁধে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এই ধরনের ওষুধে MRP-র ৩০ শতাংশের বেশি ট্রেড মার্জিন রাখা যাবে না।
এই নিয়মের আওতায় থাকবে দেশীয় ও বিদেশি সংস্থার তৈরি ক্যানসারের ওষুধ। মূলত ওষুধের সরবরাহ ও বিপণনের বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফা নিয়ন্ত্রণ করতেই এই পদক্ষেপ।
কেন্দ্রীয় সরকার সূত্রে খবর, নতুন নিয়ম কার্যকর হলে নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এর ফলে ক্যানসারের চিকিৎসায় রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে খরচের পরিমাণ অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের অনুমান, এই সিদ্ধান্তের ফলে বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে রোগীদের। বিশেষ করে যাঁদের দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে এবং নিয়মিত দামি ওষুধ কিনতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে সব ওষুধের দাম একই হারে কমবে না।
সম্প্রতি ক্যানসারের ওষুধের দাম সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে ওষুধের PTR (Price to Retailer) এবং MRP (Maximum Retail Price)-র মধ্যে বিপুল ব্যবধান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট।
শুনানিতে একটি ক্যানসারের ওষুধের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যে ওষুধ খুচরো বিক্রেতারা প্রায় ২,৭০০ টাকায় কিনছেন, সেই ওষুধের প্যাকেটে MRP লেখা রয়েছে ২৭,০০০ টাকা। অর্থাৎ, কেনার দাম ও সর্বোচ্চ খুচরো মূল্যের মধ্যে প্রায় দশ গুণ ফারাক থাকে।
এই বিপুল দামের ব্যবধান নিয়ে কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে শীর্ষ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, জীবনদায়ী ওষুধের ক্ষেত্রে এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কোনওভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টিকে রোগীদের সঙ্গে প্রকাশ্য লুটের শামিল বলেও মন্তব্য করে আদালত।
শুধু রোগীদের উপরেই নয়, সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে এই ধরনের দামি ওষুধ কেনা হলে তার আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের উপরেও পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট।
তবে এই প্রথম নয়, এর আগেও ক্যানসারের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ করেছিল কেন্দ্র। ২০১৯ সালে ক্যানসারের ওষুধের ট্রেড মার্জিন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারি সূত্রের দাবি, সেই পদক্ষেপের ফলে ৫২৬টি ব্র্যান্ডের ওষুধের ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৯৮৪ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছিল।
এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে নন-শিডিউলড ক্যানসারের ওষুধের ট্রেড মার্জিন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ওষুধের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি। কয়েক মাস থেকে শুরু করে বছরের পর বছর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয় রোগীদের। ফলে ওষুধের পিছনে বিপুল টাকা খরচ হয়। অনেক পরিবারকে চিকিৎসার খরচ জোগাতে সঞ্চয় ভাঙতে কিংবা ঋণ নিতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে ক্যানসারের ওষুধের দাম কমলে রোগী ও তাঁদের পরিবারের আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও কমতে পারে। তবে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে কোন কোন ওষুধের দাম কতটা কমবে, তা সংশ্লিষ্ট ওষুধের বর্তমান মূল্য ও ট্রেড মার্জিনের উপর নির্ভর করবে।