
রায়পুর: কখনও ‘কালো’, কখনও ‘মোটা’ বলতেন স্ত্রী। আর তাতেই বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করে বসেন স্বামী। তবে, এই ধরনের অভিযোগ বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য যথেষ্ঠ কারণ নয়। সম্প্রতি, বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলায় এমনই পর্যবেক্ষণ ছত্তীশগড় হাইকোর্টের। একইসঙ্গে ওই ব্যক্তির বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে বিচারপতি পার্থ প্রতীম সাহু এবং বিচারপতি শচীন সিং রাজপুতের ডিভিশন বেঞ্চ।
জাঞ্জগির-চাম্পা জেলার বাসিন্দা ২৮ বছরের অক্ষ ঘোষ। ২০১৯ সালের ৭ মার্চ রায়গড় জেলার বাসিন্দা ২৫ বছরের পূজা সীতের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রায় দুই থেকে তিন মাস স্বামী এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে ছিলেন পূজা। স্বামীর মূল অভিযোগ ছিল যে তাঁকে মোটা ও কালো বলে কটাক্ষ করতেন তাঁর স্ত্রী। এছাড়াও হুমকি দেওয়া-সহ একাধিক অভিযোগ তুলে পারিবারিক আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেছিলেন।
তবে, পারিবারিক আদালত তাঁর বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ করে দেয়। পাশাপাশি স্ত্রীর ‘স্ত্রীধন’ ফেরতের আবেদন মঞ্জুর করে। অর্থাৎ স্ত্রীর বাবা-মায়ের দেওয়া উপহার ও সম্পত্তি এক মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল স্বামীকে। ২০২৪ সালের ২৮ অগস্ট পারিবারিক আদালতের দেওয়া রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অক্ষ।
ওই মামলারই শুনানি চলছিল ছত্তীশগড় হাইকোর্টে। গত ২৫ জুন মামলার শুনানি শেষে রায়দান স্থগিত রেখেছিল আদালত। ১৮ সেপ্টেম্বর সেই রায় ঘোষণা করা হয়।
স্ত্রী পূজার প্রতি অক্ষ-র অন্যতম অভিযোগ ছিল, তাঁকে ‘কালো’ ও ‘মোটা’ বলে কটাক্ষ করতেন তাঁর স্ত্রী। এছাড়াও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই স্ত্রী তাঁর সঙ্গে বিরূপ আচরণ করতেন। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকিও দিতেন। পাশাপাশি প্রায়ই বাপের বাড়ি চলে যেতেন বলে অভিযোগ। যেমন স্বামীর অনুমতি না নিয়ে এক আত্মীয়ের বিয়েতে যোগ দিতে রাজস্থান চলে যাওয়া এবং প্রায় ২৫ দিন পরে ফিরে আসার মতো অভিযোগও করেছেন স্ত্রীর বিরুদ্ধে।
অক্ষ দাবি করেন, পূজার যমজ সন্তানের গর্ভপাত হয়। আর তারপরই পূজার মা তাঁকে রায়গড়ে নিয়ে যান। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করলেও তিনি শ্বশুরবাড়িতে ফিরতে রাজি হননি বলে অভিযোগ করেন স্বামী।
অন্যদিকে, স্বামীর যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেন স্ত্রী। তাঁর পাল্টা অভিযোগ, অন্য এক মহিলার সঙ্গে বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল অক্ষর। সেই সম্পর্কের কথা জানার পর থেকেই মদ্যপান শুরু করেন অক্ষ এবং তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
পূজার আরও দাবি, গর্ভাবস্থায় তাঁর যথাযথ যত্ন নেওয়া হয়নি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেননি অক্ষ। অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর মা তাঁকে রায়গড়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। সুস্থ হওয়ার পর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছে বারবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তাঁরা তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি বলে দাবি করেন পূজা।
এরপর ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পূজার মা রায়গড়ের পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ জানান। স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গার্হস্থ্য হিংসা আইনেও বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা করেন পূজা।
সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে হাইকোর্ট জানায়, স্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি আবেদনকারী। আদালতের পর্যবেক্ষণ, স্বামী একাধিক অভিযোগ করলেও তার সমর্থনে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। এছাড়া কালো ও মোটা কটাক্ষ নিয়ে ছত্তীশগড় হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, এই অভিযোগগুলি বিবাহবিচ্ছেদের মামলার জন্য যথেষ্ট কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
একইসঙ্গে আদালত জানায়, কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই স্ত্রী বাপের বাড়িতে থাকছিলেন, এটাও প্রমাণ করতে পারেননি স্বামী। ফলে পারিবারিক আদালত সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে বিবেচনা করেই বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন খারিজ করেছে বলে মত হাইকোর্টে। তাই পারিবারিক আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপের কোনও কারণ নেই জানিয়ে স্বামীর আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়।