
কলকাতা: কারোর জীবনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হল জমি কেনা বা বাড়ি তৈরি করা। তবে জমি কেনার ক্ষেত্রে শুধু দলিল দেখলেই হয় না। সারা জীবনের বিনিয়োগ এটি, তাই জমি কেনার আগে আর কী কী নথি যাচাই করে নেওয়া উচিত, তা সকলের জেনে রাখা দরকার। রাজ্যে জমি কেনার জন্য কী কী কাগজ খতিয়ে দেখা উচিত?
জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রথমেই দেখতে হবে যিনি বিক্রেতা, তিনি সত্যিই জমিটির বৈধ মালিক কি না। বিক্রয় ডিড (Sale Deed), গিফ্ট ডিড (Gift Deed), পার্টিশন ডিড (Partition Deed), উইল (Will) বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাগজ পরীক্ষা করতে হবে। শুধু ফটোকপি নয়, সম্ভব হলে রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখা উচিত।
জমির পরচা বা রেকর্ড অব রাইটস (Record of Rights)-এ কার নাম রয়েছে, জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, জমির শ্রেণি ও পরিমাণ কত—এসব মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিক্রেতার দলিলের তথ্যের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য না মিললে সতর্ক হতে হবে।
দলিল, খতিয়ান এবং বাস্তবে জমির অবস্থান—তিন জায়গায় দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মৌজা একই কি না, সেটি দেখুন। প্রয়োজনে আমিন/সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপিয়ে নিতে পারেন। কারণ কাগজে যতটা জমি লেখা আছে, বাস্তবে তার চেয়ে কম জমি থাকলে পরে সমস্যা হতে পারে।
বিক্রেতার নামে জমিটির মিউটেশন (Mutation) হয়েছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া উচিত। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু মিউটেশন থাকলেই মালিকানা সম্পূর্ণ প্রমাণিত হয় না। মূল মালিকানার দলিল ও অন্যান্য রেকর্ডও যাচাই করা প্রয়োজন।
জমির খাজনা (Land Revenue) নিয়মিত দেওয়া হয়েছে কি না, তা দেখে নেওয়া উচিত। বকেয়া থাকলে তার পরিমাণ এবং দায় কার- তা পরিষ্কার করে জেনে নিন।
জমিটি আগে কোনও ব্যাঙ্কে ঋণের জন্য বন্ধক রাখা হয়েছে কি না, অন্য কারও কাছে বিক্রি/হস্তান্তর করা হয়েছে কি না বা অন্য কোনও দাবি রয়েছে কি না যাচাই করুন। এর জন্য সংশ্লিষ্ট সাব রেজিস্ট্রার বা রেজিস্ট্রি অফিসের নথি পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে সম্পত্তি নিয়ে আইনজীবীর মতামত নিন।
আপনি যে ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কিনছেন, তিনি কীভাবে জমির মালিক হলেন- সেটা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।প্রতিটি হস্তান্তরের বৈধ দলিল আছে কি না পরীক্ষা করুন।
জমিটি কৃষিজমি, বসতজমি, বাণিজ্যিক বা অন্য কোনও শ্রেণির কি না যাচাই করুন। আপনি যে উদ্দেশ্যে জমিটি কিনছেন, সেই কাজে ব্যবহার করা আইনত সম্ভব কি না সেটাও আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার। বিশেষ করে বাড়ি করার জন্য জমি কিনলে শুধু জমি পছন্দ হলেই হবে না—জমির ব্যবহার (land use), কনভারশন (conversion) এবং স্থানীয় প্ল্যানিং/বিল্ডিং রুলস (planning/building rules) প্রযোজ্য কি না দেখতে হবে।
জমি নিয়ে কোনও দেওয়ানি মামলা, উত্তরাধিকার বিরোধ, সীমানা নিয়ে বিরোধ (boundary dispute) বা আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না খোঁজ নিন। বিক্রেতার কাছ থেকেও লিখিতভাবে ঘোষণা নেওয়া যেতে পারে যে জমিটি কোনও মামলা বা বিরোধের মধ্যে নেই।
বিক্রেতা যদি বলেন জমিটি বাবা-মা বা অন্য কোনও আত্মীয়ের কাছ থেকে পেয়েছেন, তাহলে মৃত্যুর শংসাপত্র (Death Certificate), উইল বা উত্তরাধিকার নথি (Will/Legal Heir documents) অধিকার যাচাই করতে হবে। একাধিক উত্তরাধিকারী থাকলে সকলের সম্মতি ও বৈধ হস্তান্তরের অধিকার আছে কি না, তা যাচাই করে রাখা দরকার।
মালিক নিজে বিক্রি না করে কোনও পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বিক্রি করেন, তাহলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বৈধ কি না এবং তা সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বিক্রির ক্ষমতা দেয় কি না, তা জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বাস্তবে অন্য কেউ জমিটি দখল করে আছে কি না দেখুন। চারদিকের সীমানা (boundary), রাস্তা দিয়ে প্রবেশের অধিকার, প্রতিবেশী জমির সীমানা ইত্যাদিও যাচাই করে নেওয়া দরকার।
জমি কেনার ক্ষেত্রে শুধু অনলাইনে রেকর্ড দেখে বা দালালের কথায় ভরসা করা নিরাপদ নয়। পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ভূমি-রেকর্ডের তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি রেজিস্ট্রি অফিসের নথি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষের রেকর্ডও পরীক্ষা করা উচিত। বড় অঙ্কের টাকা জড়িত থাকায় জমির দলিল ও title chain একজন প্রপার্টি লইয়ার (property lawyer) দিয়ে যাচাই করানো খুব গুরুত্বপূর্ণ।