
বৃষ্টির অভাব, শুকিয়ে যাচ্ছে কুয়ো, কমছে জলাধারের জল। ভয়াবহ খরার কবলে মহারাষ্ট্র। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক, আঙুর, আম, কলা ও বেদানা চাষিরা ফলন বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ফলন বাঁচাতেও মরিয়া হয়ে উঠেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোথাও জলের ট্যাঙ্কার, কোথাও আবার বিশেষ ট্রেনে করে জল সরবরাহের দাবি উঠেছে। চাষিদের আশঙ্কা, গাছ একবার শুকিয়ে গেলে নতুন করে বাগান তৈরি করে ফলন পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
কেন এই খরা?
এল নিনোর ভয়ঙ্কর প্রভাবের জেরেই খরা দেখা দিয়েছে মহারাষ্ট্রে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস রাজ্যের ৩৫৮টি তালুকের মধ্যে ২৬৫টিতে খরা ঘোষণা করেছেন।
সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যের মোট ৩৫৮টি তালুকের মধ্যে ২৬৫ টিকেই খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ, রাজ্যের প্রায় ৭৪ শতাংশ অংশ খরার কবলে। স্বাভাবিকের তুলনায় ১৮.৮ শতাংশ বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় মারাঠওয়াড়া ও বিদর্ভের মতো অঞ্চলে কৃষিকাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এবারের খরা ১৯৭২ সালের ভয়াবহ খরাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।
মহারাষ্ট্রের নাসিক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঙুর উৎপাদন কেন্দ্র। কিন্তু জলের অভাবে আঙুরের গাছও শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। অক্টোবর মাসে আঙুর গাছ মূলত পরিচর্যা করে থাকেন কৃষকর, যাতে মার্চ-এপ্রিলে মরসুমের সময় আঙুরের ফলন ভালো হয়। কিন্তু এখন জল না পেলে শুধু চলতি মরশুম তো বটেই, পরবর্তী বছরের ফলনও মার খেতে পারে।
মহারাষ্ট্র ‘গ্রেপ গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের’ সভাপতি কৈলাস ভোঁসলে জানিয়েছেন, “প্রায় দু’মাস বৃষ্টি হয়নি। কৃষি কাজে জলাধারের জল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকায় চাষিরা সমস্যায় পড়েছেন। অন্তত আঙুরের গাছগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা করুক। ট্যাঙ্কারে বা প্রয়োজনে ট্রেনের মাধ্যমে জল সরবরাহ করুক।
আঙুরগাছ নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে চারা লাগাতে হবে। সেই গাছ থেকে বাণিজ্যিকভাবে ফলন পেতে অন্তত চার বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।”
শুধু আঙুর নয়, আম, বেদানা ও কলাচাষিরাও একই সঙ্কটের মুখে পড়েছেন। মহারাষ্ট্রের অমরাবতীতে কমলালেবুর বাগানেও ব্যাপক ক্ষতির খবর মিলেছে। একাধিক এলাকায় গাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চাষিরা। যেসব গাছ এখনও টিকে রয়েছে, সেগুলিতে ফুল আসা, ফলের বৃদ্ধি এবং ফলের আকার নিয়েও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
নাসিকের কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রধান অনিল মেহেরের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ফলের মোট উৎপাদনের মাত্র ৩০ শতাংশ বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। তাঁর মতে, গাছ ও মাটিকে সরাসরি সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করতে বিশেষ শেড নেট ব্যবহার করতে হবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যে প্রায় ১.৬৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে আম, ১.৪১ লক্ষ হেক্টরে কলা, ১.১৯ লক্ষ হেক্টরে আঙুর এবং ১.০৭ লক্ষ হেক্টরে ডালিমের চাষ হয়েছিল। কিন্তু এবার অনেক কম। কৃষিক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব রাজ্যের অর্থনীতি এবং দেশের ফলের বাজারেও পড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
খরা মোকাবিলায় রাজ্য সরকারও কিছু পদক্ষেপ করেছে। কৃষিঋণ পুনর্গঠন, জমির রাজস্বে ছাড়, কৃষিঋণ আদায় স্থগিত রাখা এবং বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কিছু ছাড়ের কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদলও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে। কেন্দ্রের কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়েছে রাজ্য সরকার।
তবে চাষিদের বক্তব্য, ক্ষতিপূরণ বা ঋণে ছাড়ের পাশাপাশি এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি পর্যাপ্ত জল। কারণ, এক মরশুমের ফসল নষ্ট হলে পরের বছর আবার চাষের সুযোগ থাকে। কিন্তু বহু বছরের পুরনো ফলের গাছ শুকিয়ে গেলে সেই ক্ষতি পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগে।
এল নিনো কী?
প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় যে আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাকেই এল নিনো বলে। মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, যা এল নিনোর একটি প্রধান সূচক, স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছে।