
সবে একটু স্বস্তি মিলেছিল। আবার বাড়ল দুশ্চিন্তা। আর কয়েকদিন পর থেকে জ্বালানি পাওয়া যাবে তো? এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাবে? বিদ্যুতের জোগান থাকবে তো? নাকি অন্ধকারেই দিন কাটাতে হবে! এই আতঙ্কের কারণ সেই ইরান-আমেরিকার সংঘাত। দুই সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করার পরও সমস্যা বেড়েছে বই কমেনি। এতদিন সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালী খুলতে চাইছিল না ইরান। পাকিস্তানে বসে শান্তি চুক্তি আলোচনা ব্যর্থ হতেই খেলা ঘুরিয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন তিনি হরমুজ এবং ইরান ও তার আশেপাশের উপকূলের বন্দরগুলিতে জাহাজের ঢোকা-বেরনো বন্ধ করে দিচ্ছেন। এতেও চাপ বাড়ল ভারতের উপরেই। এলপিজির দাম তো আগেই বেড়েছিল, এবার কি পেট্রোল-ডিজেলের দামও আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে?
এতদিন হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) খুলতে চাইছে না ইরান (Iran)। এবার তার পাল্টা জবাবে ইউএস সেন্ট্রাল কম্যান্ড (US Central Command) আটকে দিল ইরানের বন্দরে প্রবেশ ও বেরনোর পথ। আজ ১৩ এপ্রিল, সোমবার সকাল ১০ টা থেকে (যা ভারতীয় সময় অনুযায়ী সন্ধে সাড়ে ৭টা থেকে) ইরানের বন্দরে ঢোকা-বেরনো আটকাতে শুরু করল আমেরিকা। আমেরিকার সেন্ট্রাল কম্যান্ড জানিয়েছে, ইরানের বন্দর ও উপকূলবর্তী এলাকায় আসা ও বেরনো সমস্ত দেশের জাহাজই আটকানো হবে। অর্থাৎ ইরান, ওমান উপকূল ও মধ্য প্রাচ্য উপকূল থেকে যাতায়াত করা সমস্ত জাহাজই আটকাবে আমেরিকা। তা সে বন্ধু দেশই হোক বা শত্রু দেশ।
তবে ইরান ছাড়া অন্য কোনও দেশ থেকে আসা জাহাজ, যা হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাবে, সেই জাহাজের পথ আটকাবে না আমেরিকা। ওমান উপকূল ও হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি এলেই মার্কিন নৌসেনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার এই সিদ্ধান্তে ভারতের উপরে চাপ বাড়তে পারে অনেকটাই, কারণ দেশে তেল ও জ্বালানির চাহিদার ৬০-৭০ শতাংশই আমদানি করা হয়। এক্ষেত্রে মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলির উপরে অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। এই তেলের বড় অংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। অর্থাৎ এই জলপথ বন্ধ হলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ বড় ধাক্কা খাবে। সেখানে ইরানের বন্দরের পথ বা ওমানের পথ আটকালে, ভারতে তেল ও জ্বালানির দাম অনেকটাই বাড়তে পারে।
এখানে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব নতুন করে বলার প্রয়োজন রাখে না। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত তেল পরিবহন রুট হল হরমুজ প্রণালী। প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। তাই এখানে সমস্যা হলে বা পথ অবরুদ্ধ হলে শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই তেলের দাম বাড়ে।
যদি এই পথ বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে
সাধারণ মানুষের খরচও বাড়বে কারণ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দামও বাড়বে। এই রুট শুধু তেল নয়, গ্যাস (LNG) ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ে।
যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়, তাহলে বিকল্প রুট যেমন পাইপলাইন বা অন্য সমুদ্রপথ ব্যবহার করা ভারতের জন্য কঠিন ও ব্যয়বহুল। এরফলে বড় রকমের সংকট তৈরি হতে পারে। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ‘গেটওয়ে’ হল হরমুজ প্রণালী। এই পথ যত নিরাপদ থাকবে, ভারতের অর্থনীতি তত স্থিতিশীল থাকবে।
আমেরিকা যদি সত্যি ইরানের বন্দরে প্রবেশ ও বেরনোর পথ বন্ধ করে দেয়, তাতে ইরান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম দ্রুত বাড়তে পারে। ইতিমধ্যেই সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সোমবার সকালে অপরিশোধিত ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৪.২৫ ডলারে পৌঁছেছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০১ ডলারে পৌঁছেছে।
ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের বেশিরভাগই আমদানি করে। সরবরাহ কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়বে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে ভারতের পেট্রোল-ডিজেলের দামে।
আর তেলের দাম বাড়লে—
মধ্যপ্রাচ্য থেকেই যেহেতু ভারতের বড় অংশের LPG ও LNG আসে, সরবরাহ ব্যাহত হলে রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিল্পে বড় প্রভাব পড়বে। অনেক শিল্প যেমন-কেমিক্যাল, সার, ম্যানুফ্যাকচারিং তেল ও গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, ফলে ব্যবসায় চাপ বাড়বে।
ইরান-আমেরিকা সংঘাত শুধু একটি কূটনৈতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি ভারতের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি এই দুই দেশের সংঘাত চলতেই থাকে, তবে তেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস সঙ্কট এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব খুব দ্রুতই অর্থাৎ কয়েক মাসের মধ্যেই অনুভূত হতে পারে।