
দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার আসল মাপকাঠি শুধু কত কিলোমিটার রাস্তা বা সেতু তৈরি হল, তা নয়। বরং যাত্রায় কতটা সময় বাঁচছে, সেটাই এখন বড় বিষয়। নতুন সেতু, সুড়ঙ্গ, এক্সপ্রেসওয়ে এবং দ্রুতগতির রেল পরিষেবার মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন শহর, অঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার মধ্যে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।
আগে যেখানে ঘুরপথে বা দুর্গম এলাকা কিংবা ধীরগতির রাস্তায় যাতায়াতে অনেকটা সময় লেগে যেত, সেখানে এখন সরাসরি এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। দেশের আরও বেশি এলাকায় দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হওয়ায় দৈনন্দিন যাতায়াতে দূরত্ব আর আগের মতো বড় বাধা হয়ে থাকছে না।
নদী পারাপারের দীর্ঘ এবং ধীর যাত্রার বদলে এখন একাধিক সেতু যাতায়াতকে অনেক সহজ করে তুলেছে। যে পথ পেরোতে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানেই এখন অনেক কম সময়ে পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছে।
ভূপেন হাজারিকা সেতু: ধোলা-সাদিয়া সেতু, অসম–অরুণাচল প্রদেশ (মে, ২০১৭)
অসমের রূপাই থেকে অরুণাচল প্রদেশের মেকা/রোয়িং পর্যন্ত এই সেতুর দৌলতে যাতায়াতের সময় ৬ ঘণ্টা থেকে কমে ১ ঘণ্টা হয়েছে। ফলে ৫ ঘণ্টা সময় বাঁচছে।
বগিবিল সেতু, অসম (ডিসেম্বর, ২০১৮)
ব্রহ্মপুত্র নদের উপর তৈরি এই রেল-রোড সেতু ধেমাজি এবং ডিব্রুগড়ের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে ঘুর পথে যাতায়াতে প্রায় গোটা দিন লেগে যেত, এখন সেই যাত্রা প্রায় ১-২ ঘণ্টায় করা সম্ভব হয়েছে।
অটল সেতু, মহারাষ্ট্র (জানুয়ারি, ২০২৪)
মুম্বই ট্রান্স হারবার লিঙ্ক মুম্বই ও নবি মুম্বইয়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করেছে। এর ফলে ২ ঘণ্টার যাত্রার সময় কমে প্রায় ২০ মিনিট নেমে দাঁড়িয়েছে।
কোশি রেল মহাসেতু, বিহার (সেপ্টেম্বর, ২০২০)
কোশি রেল মহাসেতু নির্মাণের ফলে নির্মলি ও সরাইগড়ের মধ্যে রেলযাত্রার সময় প্রায় ৮ ঘণ্টা থেকে কমে ৩০ মিনিট হয়েছে। একই সঙ্গে দূরত্ব প্রায় ৩০০ কিলোমিটার থেকে কমে মাত্র ২২ কিলোমিটারে নেমে দাঁড়িয়েছে।
সিসেরি নদী সেতু, অরুণাচল প্রদেশ (নভেম্বর, ২০১৯)
২০০ মিটার দীর্ঘ সিসেরি নদী সেতু, পাসিঘাট ও রোয়িংয়ের মধ্যে যাত্রার সময় প্রায় ৫ ঘণ্টা কমিয়েছে। এর ফলে দিবাং ভ্যালি এবং সিয়াংয়ের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
ভারতের বেশ কিছু দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সুড়ঙ্গ তৈরি করে যাতায়াতের পথ ছোট করা হচ্ছে। পাহাড়ি ঘুরপথ, দুর্গম রাস্তা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে সরাসরি পথ তৈরি হওয়ায় যাত্রার সময়ও কমছে।
অটল টানেল, হিমাচল প্রদেশ (অক্টোবর, ২০২০)
৯.০২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ রোহতাং পাসকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। মানালি–সারচুর মধ্যে দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার কমেছে। এতে ৪-৫ ঘণ্টা সময় বাঁচছে যাতায়াতে। লাহুল-স্পিতিতে সারা বছর যোগাযোগ ব্যবস্থাও নিশ্চিত হয়েছে।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় টানেল, জম্মু ও কাশ্মীর (এপ্রিল, ২০১৭)
৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গ দুর্গম এলাকা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তা কমেছে এবং জম্মু ও শ্রীনগরের মধ্যে যাত্রার সময় প্রায় ২ ঘণ্টা কমেছে।
বানিহাল–কাজিগুন্ড রোড টানেল, জম্মু ও কাশ্মীর (এপ্রিল, ২০২২)
৮.৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জোড়া সুড়ঙ্গ রাস্তার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার কমিয়েছে। যাত্রার সময়ও প্রায় দেড় ঘণ্টা কমেছে।
সেলা টানেল, অরুণাচল প্রদেশ (মার্চ, ২০২৪)
প্রায় ১৩,০০০ ফুট উচ্চতায় তৈরি এই সুড়ঙ্গ তেজপুর–তাওয়াং রুটে সব ঋতুতেই যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। ১ ঘণ্টার বেশি সময় কমেছে যাতায়াতে।
নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ব্যবস্থা, দ্রুতগতি এবং তুলনামূলকভাবে সরাসরি রুটের মাধ্যমে এক্সপ্রেসওয়েগুলি শহরগুলির মধ্যে যাতায়াতের গতি বদলে দিচ্ছে। যে দীর্ঘ যাত্রায় আগে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত, এখন তার সময় অনেকটাই কমে এসেছে।
• দিল্লি–মিরাট এক্সপ্রেসওয়ে (২০২১)
৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প দিল্লি থেকে মিরাটের যাত্রার সময় প্রায় আড়াই ঘণ্টা থেকে কমিয়ে প্রায় ৫০ মিনিট করেছে।
• বেঙ্গালুরু–মাইসোর এক্সপ্রেসওয়ে (মার্চ, ২০২৩)
১১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এক্সপ্রেসওয়ের ফলে বেঙ্গালুরু থেকে মাইসোরের যাত্রার সময় প্রায় ৩ ঘণ্টা থেকে কমে ৭৫ মিনিট হয়েছে।
• দিল্লি–দেহরাদুন ইকোনমিক করিডর (এপ্রিল, ২০২৬)
২১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারযুক্ত করিডর দিল্লি ও দেরাদুনের মধ্যে যাত্রার সময় ৬ ঘণ্টার বেশি থেকে কমিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা করেছে।
• মুম্বই–নাগপুর সমৃদ্ধি মহামার্গ (ডিসেম্বর, ২০২২)
৭০১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারযুক্ত এক্সপ্রেসওয়ে মুম্বই ও নাগপুরের মধ্যে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। ১৬ ঘণ্টার পথ কমে ৮ ঘণ্টায় কমে এসেছে।
• আহমেদাবাদ–ধোলেরা এক্সপ্রেসওয়ে (মার্চ, ২০২৬)
১০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারযুক্ত গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে আহমেদাবাদ ও ধোলেরার মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি করেছে।
বৈষ্ণোদেবীর তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের যাতায়াতে সুবিধার পাশাপাশি এই এক্সপ্রেসওয়ে করিডরের পাশে শিল্প ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়নেও সাহায্য করবে।
• দিল্লি–মুম্বই এক্সপ্রেসওয়ে
৩৩ ঘণ্টার পথ কমে প্রায় ১২ ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। এই গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে দিল্লি থেকে মুম্বইয়ের যাত্রার সময় প্রায় ৩৩ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে প্রায় ১২ ঘণ্টায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের ট্রেন এবং হাই-স্পিড রেল করিডর রেলযাত্রায় সময় বাঁচানোর নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ২০২৬ সালের রেলওয়ে টাইমটেবিলেও তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সারা দেশে মোট ৫৪৯টি ট্রেনের গতি বাড়ানো হয়েছে।
এর মধ্যে—
• বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, নয়াদিল্লি–বারাণসী (ফেব্রুয়ারি, ২০১৯)
আগের পরিষেবার তুলনায় ৪০–৫০ শতাংশ দ্রুত হয়েছে। ভারতের প্রথম বন্দে ভারত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে নয়াদিল্লি–কানপুর–প্রয়াগরাজ–বারাণসী রুটে চালু হয়। নয়াদিল্লি থেকে বারাণসীর নির্ধারিত যাত্রার সময় প্রায় ৮ ঘণ্টা। এই পরিষেবা আগের ট্রেনগুলির তুলনায় প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ দ্রুত হয়েছে।
• বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, কাটরা–শ্রীনগর (জুন, ২০২৫)
এই ট্রেনের কারণে ২–৩ ঘণ্টা সময় বাঁচছে। এই ট্রেন কাটরা থেকে শ্রীনগরের যাত্রার সময় প্রায় ৩ ঘণ্টায় কমিয়ে এনেছে। সম্প্রসারিত জম্মু–শ্রীনগর পরিষেবা এখন মাত্র ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিটে যাত্রা সম্পূর্ণ করছে।
• বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, বারাণসী–খাজুরাহো (নভেম্বর, ২০২৫)
এই ট্রেনের দৌলতে প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় বাঁচছে। আগে চালু থাকা স্পেশাল ট্রেনগুলির তুলনায় এই পরিষেবা প্রায় ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় বাঁচায়।
• বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, এরনাকুলাম–বেঙ্গালুরু (নভেম্বর, ২০২৫)
এই ট্রেন ৮ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে যাত্রা সম্পূর্ণ করে। ফলে আগের তুলনায় ২ ঘণ্টার বেশি সময় বাঁচে।
• বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, লখনউ–সাহারানপুর (নভেম্বর, ২০২৫)
প্রায় ১ ঘণ্টা সময় বাঁচছে, ট্রেনটি প্রায় ৭ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে যাত্রা সম্পূর্ণ করে।
• বন্দে ভারত স্লিপার, হাওড়া–গুয়াহাটি (জানুয়ারি, ২০২৬)
ভারতের প্রথম বন্দে ভারত স্লিপার ট্রেন সারাইঘাট এক্সপ্রেসের তুলনায় প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় বাঁচায়। এতে প্রায় ৮২৩ জন যাত্রীর জন্য ১৬টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ রয়েছে। প্রায় ১৭ ঘণ্টার যাত্রা পথ কমে ১৪ ঘণ্টায় নেমে দাঁড়িয়েছে।
হাই-স্পিড রেল করিডর
সড়কপথে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে ৮–৯ ঘণ্টা সময় লাগত। তা মাত্র ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিটে সম্পন্ন হবে। ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরে ট্রেনের সর্বোচ্চ পরিচালন গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার হবে এবং মোট ১২টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রথম সমুদ্রের তলা দিয়ে যাওয়া রেল সুড়ঙ্গ, যা থানে ক্রিকের নিচে প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। প্রথম পরিষেবা চালুর লক্ষ্য আগস্ট, ২০২৭।
২০২৬–২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে এই ৭টি হাই-স্পিড রেল করিডর ঘোষণা করা হয়েছে। মোট প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরগুলিতে আনুমানিক ১৬ লক্ষ কোটি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার এই পরিবর্তন দেশের বিভিন্ন শহর, অঞ্চল এবং মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে। সেতু ও সুড়ঙ্গ নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। অন্যদিকে এক্সপ্রেসওয়ে এবং আধুনিক রেল পরিষেবা দীর্ঘপথের যাত্রাকে আরও দ্রুত করে তুলছে।
সব মিলিয়ে এই পরিকাঠামোগত প্রকল্পগুলি যাতায়াতকে আরও সহজ করছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও সুযোগের পরিধি বাড়িয়ে দিচ্ছে।