
নয়া দিল্লি: বাজারে কেনাকাটা হোক কিংবা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা, হাতে টাকার নোট ধরলেই চোখে পড়ে মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) ছবি। ১০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার নোট- সব নোটেই তাঁর ছবি রয়েছে। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন অন্য কোনও স্বাধীনতা সংগ্রামী বা বিখ্যাত ব্যক্তির ছবি থাকে না? গান্ধীজির ছবিই কেন বেছে নেওয়া হল?
জাতির জনক হিসেবে গান্ধীজির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে ভারতীয় মুদ্রার মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতীয় নোটে তাঁর ছবি ছিল না।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরেও ভারতীয় নোটে ব্রিটিশ রাজা ষষ্ঠ জর্জের ছবি ব্যবহার করা হত। ১৯৪৯ সালে নতুন এক টাকার নোটে সেই ছবি সরিয়ে অশোক স্তম্ভের সিংহ প্রতীক হিসাবে রাখা হয়। ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম ব্যাঙ্ক নোট প্রকাশিত হয়। ২, ৫, ১০ এবং ১০০ টাকার এই নোটগুলির প্রতিটিতেই অশোক স্তম্ভের সিংহশীর্ষের ছবি ছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি মূল্যের নোট বাজারে আসে। পাশাপাশি নোটের পিছনের দিকের ছবিতেও পরিবর্তন দেখা যায়। নতুন ভারতের পরিচয় তুলে ধরতে বিভিন্ন বিষয়কে নোটের নকশায় স্থান দেওয়া হয়। প্রথমদিকে বাঘ ও সম্বর হরিণের মতো বন্যপ্রাণীর ছবি থাকলেও, ১৯৭০-এর দশকে কৃষিকাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যেমন—চাষাবাদ এবং চা পাতা তোলার ছবি নোটে জায়গা পায়।
১৯৮০-এর দশকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং ভারতীয় শিল্পকলার অগ্রগতিকে। যেমন, ২ টাকার নোটে আর্যভট্ট উপগ্রহ, ৫ টাকার নোটে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং ২০ টাকার নোটে কোনার্কের চাকা স্থান পায়।
১৯৬৯ সালে গান্ধীজির জন্মের শতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ সিরিজের নোট তৈরি করা হয়। সেই প্রথম তাঁর ছবি নোটে দেখা যায়। ১৯৮৭ সালে ৫০০ টাকার নোটেও তাঁর প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়।
১৯৯৬ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (RBI) ‘মহাত্মা গান্ধী সিরিজ’ চালু করার পর থেকেই নোটে তাঁর ছবি স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। এই সিরিজে উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছিল।
নোটে থাকা গান্ধীজির হাসিমুখের ছবিটি কোনও আঁকা ছবি নয়। এটি ১৯৪৬ সালে তোলা একটি আসল ছবির অংশ। ওই ছবিতে গান্ধীজির সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড ফ্রেডরিক উইলিয়াম পেথিক-লরেন্স। সেখান থেকেই গান্ধীজির মুখের অংশটি আলাদা করে নোটে ব্যবহার করা হয়। এই একটি ছবিই তখন পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে হাসি মুখে গান্ধীজিকে দেখা গিয়েছিল। গান্ধীজির এই ছবিটি মিরর ইমেজ, অর্থাৎ আসল ছবির উল্টো করা।
গান্ধীজির ছবি জাতীয় গুরুত্বের পাশাপাশি নোটের নিরাপত্তাও নকশা তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৯০-এর দশকে জাল নোট তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই সময় নতুন নোটের নকশায় গান্ধীজির প্রতিকৃতির পাশাপাশি একাধিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়।
২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘মহাত্মা গান্ধী নিউ সিরিজ’-এও তাঁর ছবি রাখা হয়। নোটের নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবর্তন এলেও গান্ধীজির প্রতিকৃতি বজায় রয়েছে।
ভারতীয় নোটে গান্ধীজি ছাড়াও অন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহারের প্রস্তাব বিভিন্ন সময়ে এসেছে। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল ভারতীয় নোটে দেবী লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের ছবি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও অতীতে নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি নোটে ব্যবহারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ভারতীয় নোটের প্রচলিত নকশায় গান্ধীজির ছবিই বজায় রয়েছে।
ভারতীয় টাকার নোটের নকশা তৈরির দায়িত্ব আরবিআই-র কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের। তবে নোটের নকশা, আকার ও উপাদান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন নেওয়া হয়। ১৯৩৪ সালের আরবিআই আইনের ২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক নোটের নকশা, রূপ ও উপাদান কেন্দ্রীয় বোর্ডের সুপারিশ বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনসাপেক্ষ। অর্থাৎ, ভারতীয় নোটে কার ছবি থাকবে, তা কোনও ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না।