
নয়া দিল্লি: সামাজিক রীতিনীতি মেনে বিয়ে করেছেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের উপস্থিতিতে সাত পাকে বাঁধা পড়েছেন। কিন্তু বিয়ের রেজিস্ট্রেশন (Marriage Registration) করাননি। এমন পরিস্থিতিতে কি আপনার বিয়ে আইনত বৈধ? বিয়ের শংসাপত্র বা ম্যারেজ সার্টিফিকেট (Marriage Certificate) না থাকলে কি স্বামী-স্ত্রী হিসাবে আইনি স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না? সত্যি কি সার্টিফিকেটের কোনও প্রয়োজন হয়? সম্পত্তির উত্তরাধিকার, পেনশন, বিমা কিংবা বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কি সমস্যায় পড়তে হতে পারে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন নিয়ে একাধিক আইন রয়েছে। ধর্ম, ব্যক্তিগত আইন এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশনের পদ্ধতি ও বাধ্যবাধকতা আলাদা হতে পারে। সম্প্রতি এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এই সংক্রান্ত রিপোর্ট তুলে ধরা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিতরাজ কৌশল জানিয়েছেন, হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ৮ নম্বর ধারায় বিয়ে নথিভুক্ত করার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে, বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধরনের দেওয়ানি বিবাহ সম্পন্ন ও নথিভুক্ত করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ মৌর্যের বক্তব্য, বিয়ের রেজিস্ট্রেশনকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে দেখা উচিত নয়। এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের আইনি অধিকার সুরক্ষিত রাখার গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।
এই প্রশ্নের উত্তর হল, না। শুধুমাত্র রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার কারণে কোনও বৈধ বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ হয়ে যায় না।
আইনজীবী অমিতরাজ কৌশল জানিয়েছেন, হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫-এর ৮(৫) ধারা অনুযায়ী, বিয়ে নথিভুক্ত না হলেও সেই কারণে আইনত বৈধ হিন্দু বিবাহের অবৈধ হয়ে যেতে পারে না।অর্থাৎ, বিয়ের সময় প্রযোজ্য আইনের সমস্ত শর্ত এবং প্রয়োজনীয় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যথাযথভাবে পালন করা হয়ে থাকলে, শুধুমাত্র ম্যারেজ সার্টিফিকেট না থাকার কারণে সেই বিয়ে অবৈধ বলে গণ্য হবে না।
তবে এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শুধু সামাজিক অনুষ্ঠান করলেই সব পরিস্থিতিতে বিয়ে আইনত বৈধ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট বিবাহ আইনের শর্ত পূরণ হওয়াও জরুরি।
ধরুন, আপনার বিয়ে হয়েছে ১০ কিংবা ২০ বছর আগে। কিন্তু সেই সময় বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করাননি। এখন কি নথিভুক্ত করা সম্ভব? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণভাবে পুরনো বিয়েও রেজিস্ট্রেশন করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নিয়ম, প্রয়োজনীয় নথি এবং বিয়ের প্রমাণ জমা দেওয়ার শর্ত পূরণ করতে হবে।
অমিতরাজ কৌশল জানিয়েছেন, বিয়ের বহু বছর পরে রেজিস্ট্রেশন করালেও তা অতীতে আইনত অবৈধ কোনও বিয়েকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ করে দেয় না।
বিয়ের রেজিস্ট্রেশন না হলেও বিয়ে বৈধ হতে পারে। কিন্তু ম্যারেজ সার্টিফিকেট না থাকলে ভবিষ্যতে একাধিক প্রশাসনিক ও আইনি সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে ম্যারেজ সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে কাজ করে। যেমন—
স্বামী বা স্ত্রীর ভিসা এবং বিদেশে বসবাসের আবেদন
জীবনবিমা ও মৃত্যুকালীন আর্থিক সুবিধা দাবি
পেনশন এবং চাকরিসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা
ব্যাঙ্ক ও সরকারি নথিতে বৈবাহিক তথ্য সংশোধন
সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও অন্যান্য আইনি দাবি
বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা খোরপোশ সংক্রান্ত মামলা
তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ম্যারেজ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক, এমন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিকল্প নথি বা অন্য প্রমাণও গ্রহণ করতে পারে।
ধরুন, সামাজিক রীতি মেনে বিয়ে হয়েছে। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন হয়নি। কয়েক বছর পর স্বামী বা স্ত্রী বিয়ের সম্পর্কই অস্বীকার করলেন। সেক্ষেত্রে কী হবে? আইনজীবীদের মতে, কোনও পক্ষ বিয়ে অস্বীকার করতেই পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র ম্যারেজ সার্টিফিকেট না থাকার কারণে আদালত ধরে নেবে না যে বিয়েই হয়নি।
এক্ষেত্রে আদালত অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বিবেচনা করতে পারে। যেমন, বিয়ের ছবি, ভিডিয়ো, বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাক্ষীদের বক্তব্য, ধর্মীয় আচার পালনের প্রমাণ এবং দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসঙ্গে বসবাসের তথ্য।
তবে একসঙ্গে বসবাস করা এবং আইনত বিবাহিত হওয়া এক বিষয় নয়। আদালত সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রমাণ বিচার করবে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিয়ের সরকারি নথি না থাকলে ভবিষ্যতে সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি প্রমাণ করতে অতিরিক্ত সময় এবং অর্থ খরচ হতে পারে। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার, পেনশন কিংবা বিমার টাকা দাবি করার সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে। একইভাবে খোরপোশ বা বিবাহবিচ্ছেদের মামলাতেও বিয়ের অস্তিত্ব প্রমাণ করার প্রয়োজন হতে পারে। ওই সংবাদমাধ্যমকে সিদ্ধার্থ মৌর্য জানিয়েছেন, বিয়ের রেজিস্ট্রেশন একটি সরকারি নথি তৈরি করে, যা স্বামী-স্ত্রীর আইনি ও আর্থিক স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সামাজিক বা ধর্মীয় রীতি মেনে বিয়ে হয়ে থাকলেও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা নথিভুক্ত করানো উচিত। কারণ, বিয়ের বৈধতা এবং বিয়ের প্রমাণ থাকা দুটি আলাদা বিষয়।
বি:দ্র: কোনও পদক্ষেপ করার আগে আইনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।