
নয়া দিল্লি: ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা ভারত সরকারের। কেন্দ্রের তরফে বলা হল, এই ধরনের মন্তব্য ভারতের গণতান্ত্রিক ও সভ্যতাগত চরিত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার প্রমাণ।
একদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) নেদারল্য়ান্ড (Netherlands) সফরে গিয়েছিলেন। সেই সময় এই প্রতিক্রিয়া আসে। এক ডাচ সাংবাদিক যৌথ সাংবাদিক বৈঠক না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মুসলিম-সহ সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিদেশ মন্ত্রকের সচিব (পশ্চিম) সিবি জর্জ বলেন, “ভারতের সমালোচনা প্রায়শই দেশের সামাজিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব থেকেই আসে। এই ধরনের প্রশ্ন মূলত সেই ব্যক্তির ভারতের সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণেই ওঠে।”
ভারতের গণতান্ত্রিক পরিচয় তুলে ধরে জর্জ বলেন, “ভারত একটি প্রাণবন্ত ও বহুত্ববাদী সমাজ, যার সভ্যতার ইতিহাস ৫,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো। ভারত ১৪০ কোটির দেশ, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। সংস্কৃতি, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস ও ধর্ম— সব ক্ষেত্রেই ভারত বৈচিত্র্যে ভরপুর।”
জর্জ উল্লেখ করেন, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও শিখধর্ম— এই চারটি প্রধান ধর্মের উৎপত্তি ভারতে এবং এগুলি এখনও দেশে সমানভাবে বিকশিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “বিশ্বে আর কোনও দেশ নেই যেখানে চারটি ধর্মের জন্ম হয়েছে”। তিনি আরও জানান, ইহুদি সম্প্রদায় ২,৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতে বসবাস করছে এবং কখনও নির্যাতনের শিকার হয়নি। পাশাপাশি খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতে বিকশিত হয়েছে।
ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে গণতন্ত্রের শক্তির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন বিদেশ মন্ত্রকের সচিব। তিনি বলেন, “সম্প্রতি আমাদের দেশে নির্বাচন হয়েছে। ভোটদানের হার কত ছিল, তা জানা দরকার। ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন। এটাই ভারতের সৌন্দর্য।”
ভারতকে “প্রাণবন্ত গণতন্ত্র” আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, দেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বজায় রেখেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণ করেছে। দারিদ্র্য দূর করতে আমরা কখনও হিংসার পথ বেছে নিইনি। আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তা করেছি”।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেও সহাবস্থান ও অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন জর্জ। তাঁর কথায়, “স্বাধীনতার সময় ভারতে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ১১ শতাংশ। এখন তা ২০ শতাংশেরও বেশি। এমন কোনও দেশের নাম বলতে পারবেন যেখানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা বেড়েছে? ভারতের বাইরে এমন উদাহরণ খুব কমই মিলবে। এটাই ভারতের সৌন্দর্য। আমি অনুরোধ করব, ভারত সম্পর্কে আরও জানুন, তাহলে দেশের অগ্রগতি ও বৈচিত্র্যকে আরও ভালভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন।”
প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে বৈঠকের আগে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন ভারত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডাচ সংবাদপত্র ডে ভল্সক্রান্ট (De Volkskrant)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জেটেন বলেন, ডাচ সরকারের উদ্বেগ শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, বরং সেখানে সংখ্যালঘুদের অধিকারও বিপন্ন। এই বিষয়গুলি ভারত সরকারের কাছে নিয়মিতভাবে তোলা হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় করা এক পোস্টে জেটেন জানান, ভারত ও নেদারল্যান্ডস— উভয় দেশই গণতন্ত্র, সুশাসন এবং নিয়ম ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
তিনি আরও একটি দীর্ঘদিনের শিশু অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত বিরোধের কথাও উল্লেখ করেন, যা অতীতে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছিল।