
নয়া দিল্লি: দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অস্ত্রের উপর জোর দিচ্ছে ভারত। সেই তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘নাগাস্ত্র-২’। এটি এমন এক ধরনের অস্ত্র, যা আকাশে উড়তে উড়তে শত্রুপক্ষের ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য সাঁজোয়া যানকে খুঁজে বের করতে পারে। তারপর উপযুক্ত লক্ষ্যবস্তু পেলে সরাসরি আঘাত হানতে পারে। নাগপুরের সংস্থা সোলার ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস লিমিটেড এই অস্ত্র তৈরি করেছে।
নাগাস্ত্র-২-কে সাধারণ ড্রোন ভাবলে ভুল হবে। এটি আসলে এক ধরনের ‘লয়টারিং মিউনিশন’। সহজ কথায়, এই অস্ত্র নির্দিষ্ট এলাকায় কিছুক্ষণ আকাশে উড়ে লক্ষ্যবস্তুর সন্ধান করতে পারে। লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার পর সেটিকে আঘাত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের অস্ত্রের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
নাগাস্ত্র-২-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর পাল্লা। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ মোডে এটি সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার এবং ‘রিকভার অ্যান্ড রিইউজ’ মোডে সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত কাজ করতে পারে। ‘ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট’ কথাটির অর্থ হল, লক্ষ্য নির্ধারণ করে অস্ত্রটি ছেড়ে দেওয়ার পর সেটি নিজস্ব ক্ষমতায় লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, ‘রিকভার অ্যান্ড রিইউজ’ ব্যবস্থায় অস্ত্রটিকে ফিরিয়ে এনে আবার ব্যবহার করার সুযোগ থাকে।
শত্রুপক্ষের ট্যাঙ্ক বা সাঁজোয়া যানকে আঘাত করতে হলে তার শক্তিশালী বর্ম ভেদ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগাস্ত্র-২-এ রয়েছে ৪ কেজি ওজনের বিশেষ ধরনের ওয়ারহেড। প্রস্তুতকারক সংস্থার দাবি, এই ওয়ারহেড সর্বোচ্চ ৬৫০ মিলিমিটার পুরুত্বের সমতুল্য বর্ম ভেদ করতে পারে। এই প্রযুক্তির ফলে ভারী সাঁজোয়া যানকে লক্ষ্য করার ক্ষেত্রে নাগাস্ত্র-২ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে লক্ষ্যবস্তুর সুরক্ষা এবং আঘাতের পরিস্থিতির মতো একাধিক বিষয়ের উপর।
দিনের আলো হোক বা রাতের অন্ধকার, লক্ষ্যবস্তুর উপর নজর রাখার জন্য নাগাস্ত্র-২-এ রয়েছে ক্যামেরা ব্যবস্থা। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, এটি সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট পর্যন্ত আকাশে থাকতে পারে। অর্থাৎ, কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় কিছুক্ষণ উড়ে লক্ষ্যবস্তুর সন্ধান চালানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে শুধু আগে থেকে চিহ্নিত লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যাওয়া নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও এই অস্ত্র কাজে লাগতে পারে।
যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষ ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় বাধা তৈরি করে ড্রোন বা অন্য অস্ত্রের কাজ ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারে। একে বলা হয় জ্যামিং। নাগাস্ত্র-২-এ রয়েছে ECCM প্রযুক্তি, যা এই ধরনের ইলেকট্রনিক বাধার মোকাবিলা করতে সাহায্য করার জন্য তৈরি।
তবে এই প্রযুক্তি থাকলেই সব ধরনের জ্যামিং বা GPS-সংক্রান্ত সমস্যা পুরোপুরি এড়ানো যাবে, এমন নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তব পরিস্থিতি ও পরীক্ষার ফলাফলের উপর।
তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানের মহাজন ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ২০২৬ সালের আগস্টে নাগাস্ত্র-২-এর প্রযুক্তিগত পরীক্ষা হয়েছে। প্রস্তুতকারক সংস্থার দাবি, পরীক্ষায় নির্ধারিত কার্যক্ষমতা এবং ইলেকট্রনিক বাধা মোকাবিলার মানদণ্ড পূরণ করেছে এই অস্ত্র।
তবে পরীক্ষা সফল হওয়া আর সেনাবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এক বিষয় নয়। সেনাবাহিনীর হাতে কতগুলি অস্ত্র দেওয়া হবে, কবে থেকে তা ব্যবহার করা হবে এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা কেমন হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে সরকারি ঘোষণার প্রয়োজন।
আধুনিক যুদ্ধে শত্রুপক্ষের ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যানকে দূর থেকে মোকাবিলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগাস্ত্র-২-এর মতো অস্ত্র নির্দিষ্ট এলাকায় লক্ষ্যবস্তুর সন্ধান করতে পারে এবং সুযোগ বুঝে আঘাত হানতে পারে। তাই এই ধরনের প্রযুক্তি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। আরও একটি বড় দিক হল, এই অস্ত্র দেশীয় সংস্থার তৈরি। ফলে এ ধরনের অস্ত্রের প্রযুক্তি ও উৎপাদন দেশে বাড়লে বিদেশ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।