
নয়া দিল্লি: আধুনিক বিশ্বে যে কোনও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের অন্যতম বড় সমস্যা হল স্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’র অভাব। তা সে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (Russia-Ukraine War) হোক বা পশ্চিম এশিয়ার একাধিক সংঘর্ষ। এই সংঘাতগুলিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনই অস্থিরতাও বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের অপারেশন ‘সিঁদুর’ (Operation Sindoor) একটি ভিন্নধর্মী উদাহরণ। ভারত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দ্রুত আঘাত হেনে এবং সীমিত সময়ের মধ্যে অভিযান শেষ করার অসাধারণ কৌশল ও দক্ষতা দেখিয়েছে।
অপারেশন ‘সিঁদুর’-এ ভারতের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি ও তাদের মদতদাতাদের নির্মূল করা। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়। অপারেশন সিঁদুরে ভারত নির্দিষ্টভাবে ৯টি টার্গেট চিহ্নিত করেছিল এবং নিখুঁতভাবে সেখানে আঘাত হানে। মাত্র ৮৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান সম্পন্ন করে। যা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে বিরল।
অপারেশন সিঁদুরে ভারত শুধু সীমান্তেই নয়, পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকেও আঘাত হানে। সিয়ালকোট, ভাওয়ালপুর সহ একাধিক জায়গায় জঙ্গিদের লঞ্চপ্যাড ধ্বংস করা হয় অপারেশন সিঁদুরে। এই অভিযানে লস্কর-ই-তৈবা (Lashkar-e-Taiba), জইশ-ই-মহম্মদ (Jaish-e-Mohammed) ও হিজবুল মুজাহিদ্দিন (Hizbul Mujahideen)-এর ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। ১০০-রও বেশি জঙ্গিকে নিকেশ করা হয়, যার মধ্যে মাসুদ আজহারের পরিবারের সদস্যরা ছিল।
এই অভিযানে ভারতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় শূন্য ছিল। ভারতীয় বায়ুসেনা রাফাল (Dassault Rafale), SCALP মিসাইল ও HAMMER-র মতো শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করে মাত্র ২৩ মিনিটেই মিশন সম্পন্ন করেছিল।পাকিস্তানের নুর খান এয়ারবেস (Noor Khan Airbase), সারগোধা এয়ারবেস (Sargodha Airbase)-সহ মোট ১১টি ঘাঁটিতে আঘাত হানে ভারত। অন্য়দিকে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আকাশতীর (Akashteer) ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তানের ছোড়া শতাধিক ড্রোন ও মিসাইল প্রতিহত করা হয়।
অপারেশন সিঁদুরের সাফল্যের পিছনে ছিল তিন বাহিনীর সমন্বয় এবং আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ২০১৯ সালে চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (Chief of Defence Staff) পদ তৈরি হওয়ার পর এই সমন্বয় আরও শক্তিশালী হয়েছে।দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০১৪-১৫ সালে যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৪৬,৪২৯ কোটি। তা ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বেড়ে ১.৫৪ লক্ষ কোটি টাকা করা হয়। অপারেশন সিঁদুরে ব্যবহার করা হয়েছিল ব্রাহ্মোস, আকাশ, তেজস এবং ড্রোন ও AI-চালিত সিস্টেম। এগুলি ভারতের মেড ইন ইন্ডিয়া (Made by India) সক্ষমতাকে তুলে ধরেছে।
এই অভিযানের পেছনে ছিল দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশ ছিল শুধু সন্ত্রাসবাদীদেরই যেন নিকেশ করা হয়, সাধারণ মানুষকে নয়। একইসঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Waters Treaty) স্থগিত রাখা থেকে শুরু করে সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ-সবই ছিল সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে চাপে ফেলে ভারত।
‘অপারেশন সিঁদুর’ শুধু সামরিক অভিযান ছিল না, এটি ছিল একটি সর্বস্তরের জাতীয় উদ্যোগ। ইসরো (ISRO) ১০টি স্যাটেলাইট দিয়ে নজরদারি চালায়। বিভিন্ন স্টার্টআপ ও বেসরকারি সংস্থা ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে। একই সঙ্গে ভুয়ো খবর রুখতেও লড়াই চালানো হয়।