
নয়া দিল্লি: রাজনৈতিক ব্যঙ্গ করাই যেতে পারে, তবে সেই ব্যঙ্গের নামে কারোর সম্মান বা মর্যাদাহানি করা যায় না। শুক্রবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার এআই ভিডিয়ো সংক্রান্ত মামলায় এই পর্যবেক্ষণ রাখল দিল্লি হাইকোর্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে তৈরি করা সম্মানহানিকর ও অবমাননাজনক যে ভিডিয়ো, ছবি ও পোস্টগুলি করা হয়েছিল, তা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয় আদালত।
মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা নিজেই এই মামলা করেছিলেন আম আদমি পার্টি ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে। বিচারপতি মনোজ জৈন ওই মামলার শুনানিতে রায় দেন। অবমাননাকর পোস্টগুলি সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলে যে রাজনীতিবিদদের যেমন সমালোচনা ও রাজনৈতিক মজা সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, তবে কোনও ব্যক্তির সম্মান বা মর্যাদাহানিকর পোস্ট বাক স্বাধীনতার যুক্তিতে আড়াল করা যায় না।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, “ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কোনও ব্যক্তির বিবেকে আঘাত করতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে কারও মর্যাদায় এমন অপূরণীয় ক্ষত তৈরি করার অনুমতি দেওয়া যায় না।”
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আম আমি পার্টির বিরুদ্ধে মামলা করে দাবি করেছিলেন যে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে মানহানিকর এবং এআই (AI) দিয়ে তৈরি ডিপফেক ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ, প্রচার ও ছড়িয়ে দেওয়ার উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, আম আদমি পার্টির (AAP) সরকারি ও ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে এমন কিছু ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে তাঁকে মদের বিক্রেতা, ফেরিওয়ালা এবং ডেলিভারি এজেন্ট হিসাবে দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁকে ‘হর হর রেখা অর ঘর ঘর ঠেকা’ নামে একটি প্রকল্পের প্রধান হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
রেখা গুপ্তার আইনজীবীরা আদালতে জানান, এই ভিডিয়ো ও ছবিগুলি অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং তাঁর ভাবমূর্তির পক্ষে ক্ষতিকর। তাই অবিলম্বে সেগুলি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান তাঁরা।
আদালত জানায়, অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ভিডিয়োগুলিতে রাতে পুরুষদের মদ পরিবেশন করতে দেখা গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই সময় সেখানে ঝামেলাও চলছিল এবং পিছনে বাজছিল রোম্যান্টিক গান। অন্য একটি ভিডিয়োয় মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এবং দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রীকে একসঙ্গে মদের গ্লাসে মদ ও বরফ ঢালতে দেখা গিয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি সেই ছবিগুলি এতটাই নিখুঁত যে আসল বলে মনে হতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের ছবি ও ভিডিয়ো দেখে মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই মদের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এতে তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং নৈতিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আদালত বলে, “সরকারি পদে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই একজন ব্যক্তিকে বেশি সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কোনও ব্যক্তির মর্যাদার সঙ্গে আপস করা যাবে।”
আদালতের আরও বক্তব্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলির সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক কাজকর্মের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এআই দিয়ে তৈরি ভিডিয়োর মাধ্যমে কোনও মুখ্যমন্ত্রীর সম্মান ও মর্যাদায় আঘাত করা গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হতে পারে না।
রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং কাউকে অপমান করার মধ্যে খুব সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের কথায়, “শুধুমাত্র হাস্যরস বা ব্যঙ্গের বিষয় হলে আদালত হয়তো হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু যখন কোনও ব্যক্তির মর্যাদায় আঘাত করা হয়, তাঁর সম্মান নষ্ট করা হয় এবং তাঁকে উপহাসের পাত্র করে তোলা হয়, তখন উপযুক্ত পদক্ষেপ করা আদালতের দায়িত্ব।”
প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এআই ব্যবহার করে ভিডিয়ো তৈরি করা এখন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে বলেও মন্তব্য করে আদালত। তবে এই ধরনের কনটেন্ট তৈরি এবং প্রকাশের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষেরই।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, রেখা গুপ্তার আবেদনের প্রাথমিক ভিত্তি রয়েছে এবং এই মামলায় তাঁর পক্ষেই রায় দেওয়া উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও ভিডিয়ো বা ছবি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তাঁর সম্মানের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মামলার আবেদনে উল্লেখ করা ছ’টি ইউআরএল (URL) অবিলম্বে সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি, অভিযুক্তদের আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন পাঠানো হয়েছে। সমন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তাঁদের লিখিত জবাব জমা দিতে হবে। আগামী ৪ ডিসেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।