
নয়া দিল্লি: প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানের ব্যবহার সংক্রান্ত নথি আরটিআই (RTI)-এর মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না। জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর জীবন ও শারীরিক সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের (CIC) নির্দেশ খারিজ করে দিল দিল্লি হাইকোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাকর্মীদের নাম ও পরিচয় গোপন করলেও, ওই নথি প্রকাশের ফলে নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে চলে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
দিল্লি হাইকোর্টে বিচারপতি অমিত মহাজনের সিঙ্গল বেঞ্চে সংবিধানের ২২৬/২২৭ অনুচ্ছেদের অধীনে একটি পিটিশনের শুনানি চলছিল। ওই পিটিশনে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের (CIC) ২০২০ সালের ৮ জুলাইয়ের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। ওই নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বিমানে বিদেশ সফর সংক্রান্ত নথি (Special Flight Returns বা SFRs) প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছিল।
মামলার শুনানিতে বিচারপতি অমিত মহাজনের সিঙ্গল বেঞ্চ জানায়, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের বিমানযাত্রা সংক্রান্ত নথি তথ্য জানার অধিকার আইন, ২০০৫-এর ৮(১)(ক) ও ৮(১)(ছ) ধারার অধীনে গোপন রাখা যেতেই পারে, যদি সেই তথ্য প্রকাশের ফলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার বা প্রধানমন্ত্রীর জীবন ও নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আদালত কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের নথি প্রকাশের নির্দেশ খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, শুধুমাত্র নিরাপত্তাকর্মীদের নাম মুছে দিলেই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়।
আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলে, “শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে জনগণের দেওয়া সরকারি অর্থ খরচ হয়েছে বলেই সেই সফরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়।”
এক ব্যক্তি ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে সকল ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীদের বিদেশ সফর সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে আরটিআই আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনে তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিদেশ সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত স্পেশাল ফ্লাইট রিটার্নস এর প্রথম ও দ্বিতীয় অংশের নথির কপি চেয়েছিলেন।
ভারতীয় বায়ুসেনা সফর সংক্রান্ত কিছু তথ্য দিলেও, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এসএফআর (SFR) নথি প্রকাশ করতে অস্বীকার করে। বায়ুসেনার এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে আপিল কোর্টও। এরপর বিষয়টি কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনে (CIC) পৌঁছয়। ২০২০ সালের ৮ জুলাই কমিশন বায়ুসেনাকে সংশ্লিষ্ট এসএফআর-২ (SFR-II) নথির কপি আবেদনকারীকে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় বায়ুসেনার কেন্দ্রীয় আধিকারিক।
বায়ুসেনার বক্তব্য ছিল, ওই নথিতে যাত্রীদের নাম, পদমর্যাদা, দায়িত্ব, পরিচয় সংক্রান্ত নম্বর, বিমানের তথ্য, যাত্রীর সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিবরণের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাকর্মীদের নাম ও পরিচয় মুছে দিলেও বাকি তথ্যের মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র থেকে যেতে পারে। প্রকাশ্যে থাকা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে এই নথির তথ্য মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আদালত আরও জানিয়েছে, তথ্য জানার অধিকার আইন স্বচ্ছতা ও সরকারি কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই অধিকার নিরঙ্কুশ নয়। জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবন ও শারীরিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিও বিবেচনা করতে হবে।
এই প্রসঙ্গে আদালত সিবিএসই (CBSE) বনাম আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুপ্রিম কোর্ট বনাম সুভাষ চন্দ্র আগরওয়াল মামলার পর্যবেক্ষণের উল্লেখও করে।
দিল্লি হাইকোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও তথ্য প্রকাশের ফলে জাতীয় নিরাপত্তা বা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে কি না, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মতামত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
আদালতের বক্তব্য, “শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের নাম ও পরিচয় গোপন করে নথি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া যথেষ্ট নয়। সরকারি অর্থ খরচের বিষয়টিও একা এমন তথ্য প্রকাশের পক্ষে যথেষ্ট জনস্বার্থ প্রতিষ্ঠা করে না, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে।”
শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের ২০২০ সালের ৮ জুলাইয়ের নির্দেশ খারিজ করে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর জীবন ও শারীরিক সুরক্ষার সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ভারতীয় বায়ুসেনার ওই নথি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত ছিল।