
নয়া দিল্লি: বংশ রক্ষা করতে হবে। তাই, মেয়ে নয়, ছেলে চাই। এই ভাবনা থেকে শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারের শিকার হন মহিলারা। ছেলের জন্ম না দিতে পারার ‘অপরাধে’ মহিলাদের লাগাতার হয়রানির শিকার হতে হয় শ্বশুরবাড়িতে। অনেক ক্ষেত্রে এই অপমান সহ্য করতে না পেরে চরম সিদ্ধান্ত নেন মহিলারা। এই কারণে আত্মঘাতী হওয়া মহিলার সংখ্যা নেহাত কম নয়। যতই কেন্দ্রীয় সরকার ‘বেটি বাচাও, বেটি পড়াও’ উদ্যোগ নিক, কিংবা, মহিলাদের নেতৃত্বে উন্নয়নের ডাক দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, আজও ভারতে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা কমেনি। প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন আদালতে, এই ধরনের মামলার নিষ্পত্তি করতে হয় বিচারকদের। আর এই প্রেক্ষিতেই ছেলে বা মেয়ে সন্তান হওয়ার বিষয়ে সমাজকে শিক্ষিত করার সুপারিশ করল দিল্লি হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) এক মামলার রায় দানের সময়, বিচারপতি স্বর্ণকান্ত শর্মা মৌখিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, সন্তানের লিঙ্গ কী হবে, তা ঠিক করে স্বামীর ক্রোমোজোম, স্ত্রী নয়। কাজেই, কন্যা সন্তান দন্ম দেওয়ার ‘দায়’ স্বামীরই।
যৌতুকের দাবি এবং দু-দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেওয়ার প্রেক্ষিতে স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির অন্যান্যদের থেকে ক্রমাগত হয়রানির জেরে এক মহিলা আত্মঘাতী হয়েছেন বলে, অভিযোগ করেছিলেন মহিলার বাবা। নিহত মহিলার বাবার এই অভিযোগের ভিত্তিতে, গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর স্বামীকে। হাইকোর্টে, জামিনের আবেদন করেছিলেন স্বামী। এদিন, সেই আবেদন মঞ্জুর করেননি বিচারপতি স্বর্ণকান্ত শর্মা। বরং, এই ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে সমাজকে শিক্ষিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ করেন বিচারপতি। কারণ, এই ধরনের ক্ষেত্রে জেনেটিক বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়। এই বিষয়ে বিস্ময়ও প্রকাশ করেন বিচারপতি।
তিনি বলেন, “বিজ্ঞান অনুসারে, গর্ভধারণের সময় সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে এক্স (X) এবং ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম। মহিলাদের দুটি এক্স ক্রোমোজোম (XX) এবং পুরুষদের একটি এক্স এবং একটি ওয়াই ক্রোমোজোম (XY) আছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার মতে, যে ডিম্বাণুর নিষেক ঘটে, সেটি এক্স ক্রোমোজোম বহনকারী না ওয়াই ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুর সঙ্গে মিলিত হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করে মেয়ে হবে না ছেলে হবে। ফলে, এই ধরনের লোকদের শিক্ষা দিতে হবে যে, বিবাহিত দম্পতির মিলনের মাধ্যমে যে সন্তান জন্ম নেয়, তার লিঙ্গ নির্ধারণ করে তাদের পুত্রের ক্রোমোজোম, তাদের পুত্রবধূর ক্রোমোজোম নয়।”
এই মামলার রায়ই এই ধরনের জ্ঞানে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্মস্থান হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিচারপতি। এই শিক্ষা দেওয়া গেলে, এই ধরনের অপরাধীদের মানসিকতা বদলাতে পারে। ফলে, অনেক নিরপরাধ বিবাহিত মহিলার জীবন বাঁচবে। হাইকোর্ট, আরও বলেছে, কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য মহিলাদের প্রাণ চলে যাচ্ছে, এটা কোনও বিবেকবান সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের অপরাধগুলিকে গুরুতর অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত। চলতি মামলাটির ক্ষেত্রে, এই গুরুতর অপরাধের প্রেক্ষিতে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা এখনও বাকি এবং সাক্ষ পরীক্ষা করাও বাকি। তাই, এই ক্ষেত্রে অভিযুক্ত স্বামীকে জামিন দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানায় আদালত।