
নয়া দিল্লি: এসআইআরে নাম বাদ পড়া ও জ্ঞানেশ কুমার বিতর্কের মাঝেই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার। হায়দরাবাদের নালসার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি বলেন, “কোটি কোটি নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাঁদের নিজের দেশেই ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ করে তোলার মতো কোনও পদক্ষেপই মৌলিকভাবে স্বেচ্ছাচারী“।
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পরিমার্জন (SIR) ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই গণহারে ভোটারদের বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে সংবিধানগত দিক থেকে কড়া সমালোচনা করেন তিনি। বিচারপতি ভুঁইয়া বলেন, “কোনও যুক্তিতেই এই পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।”
তিনি সতর্কবার্তাও দেন যে এ ধরনের প্রক্রিয়া সংবিধানের মূল ভিত্তিতেই আঘাত হানবে। তা ভারতের সংবিধানের অধীনে গৃহীত সাংবিধানিক ব্যবস্থাকেই অস্বীকার করার শামিল হবে। বিচারপতি ভুঁইয়া স্পষ্ট করে দেন, “সংবিধান কখনওই নাগরিকদের দু’টি শ্রেণিতে ভাগ করার কথা বলে না—এক শ্রেণির নাগরিকের ভোটাধিকার থাকবে, আর অন্য শ্রেণির থাকবে না।”
বিচারপতি ভুঁইয়ার কথায়, “তাত্ত্বিকভাবে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটিকে অন্যটি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না।”
যাকে নিয়ে এত চর্চা, সেই বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া কে জানেন?
বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার জন্ম ১৯৬৪ সালের ২ অগস্ট অসমের গুয়াহাটিতে। তাঁর বাবা সুচেন্দ্র নাথ ভুঁইয়া ছিলেন একজন প্রবীণ আইনজীবী। তিনি অসমের অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
গুয়াহাটির ডন বস্কো হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন উজ্জ্বল ভুঁইয়া। এরপর তিনি গুয়াহাটির কটন কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে দিল্লির কিরোরি মাল কলেজ থেকে কলা বিভাগে স্নাতক হন। এরপর গুয়াহাটির গভর্নমেন্ট ল কলেজ থেকে এলএলবি (LL.B.) এবং গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম (LL.M.) ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি অসম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশের বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেন।
এরপর গুয়াহাটি হাই কোর্টের প্রধান বেঞ্চ-সহ বিভিন্ন বেঞ্চে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি, সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালের গুয়াহাটি বেঞ্চ, অসম বোর্ড অব রেভিনিউ, লেবার কোর্ট, বিভিন্ন দেওয়ানি আদালত এবং অরুণাচল প্রদেশের স্টেট কনজিউমার ফোরামেও মামলা লড়েছেন তিনি।
১৯৯৫ সালের মে মাসে আয়কর দফতরের জুনিয়র স্ট্যান্ডিং কাউন্সিল হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি আয়কর দফতরে এই দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের ৩ ডিসেম্বর তাঁকে আয়কর দফতরের সিনিয়র স্ট্যান্ডিং কাউন্সিল হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
এছাড়া, ২০০২ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি মেঘালয় সরকারের অতিরিক্ত সরকারি আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০০৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অরুণাচল প্রদেশ সরকারের বন দফতরের বিশেষ আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেন।
২০১০ সালের ৩ মার্চ তাঁকে গুয়াহাটি হাই কোর্টের স্ট্যান্ডিং কাউন্সিল হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটি হাই কোর্ট তাঁকে সিনিয়র অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১১ সালের ২১ জুলাই তিনি অসমের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল নিযুক্ত হন।
২০১১ সালের ১৭ অক্টোবর বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া গুয়াহাটি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তিনি স্থায়ী বিচারপতি হন। বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি মিজোরাম স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেন। অসমের জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমি এবং গুয়াহাটির ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর তাঁকে বম্বে হাইকোর্টে বদলি করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর তিনি তেলঙ্গানা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। সেখানে তিনি তেলঙ্গানা স্টেট লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।
২০২২ সালের ২৮ জুন তিনি তেলঙ্গানা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন এবং দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন তিনি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ (NALSAR)-এর চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৩ সালের ৫ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়াকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করে। এরপর ২০২৩ সালের ১৪ জুলাই তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। তিনি বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির (NLSIU) জেনারেল কাউন্সিল এবং এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য। পাশাপাশি, মহারাষ্ট্র ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি, ঔরঙ্গাবাদের জেনারেল কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।