Diwali History in India: ১০০ বছর আগে ভারতের কোনও গ্রামে দীপাবলি কেমনভাবে পালিত হত?
How Indian families celebrated Diwali a century ago: দীপাবলি বিশেষ পর্বে সন্তোষ নায়ার এক শতাব্দী আগে পরিবারগুলিতে কীভাবে দীপাবলি উদযাপিত হত, তা তুলে ধরেছেন এক কল্পিত গল্পের মাধ্যমে। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন এক ঠাকুমা। যিনি ১১টি প্রদীপ জ্বালান। এই প্রবন্ধে কৃতজ্ঞতা, পরিবারের সদস্যদের পরিশ্রম, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া উৎসবের রীতিনীতি এবং আলোর উৎসবের নেপথ্যে থাকা সেই মানুষগুলির কথা তুলে ধরা হয়েছে, যাঁদের অবদান আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।

আজ থেকে ১০০ বছর আগের কথা। দীপাবলির রাতে ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট মাটির বাড়ির উঠোনে বসে রয়েছেন এক মহিলা। তাঁর সামনে রাখা রয়েছে ১১টি মাটির প্রদীপ। প্রতিটি প্রদীপে খুব সাবধানে কয়েক ফোঁটা করে সর্ষের তেল ঢালছেন তিনি। পাশে বসে তাঁর ছোট্ট নাতি সবকিছু দেখছিল। হঠাৎ সে প্রশ্ন করল, “ঠাকুমা, আমরা আরও বেশি প্রদীপ জ্বালাচ্ছি না কেন?” তেলের বোতলটির দিকে তাকিয়ে ঠাকুমা উত্তর দিলেন, “কারণ, আগামিকালও তো আমাদের রান্না করতে হবে।”
সেদিন সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ পর তিনি একে একে প্রদীপগুলি নিভিয়ে দিতে শুরু করলেন। শিশুটির মনে প্রশ্ন জাগল, আলোর উৎসবের শেষ কেন অন্ধকারে হবে? কিন্তু সে তখনও এতটা বড় হয়নি যে বুঝতে পারবে, ঠাকুমা আসলে দুই ধরনের আলোর মধ্যে একটিকে বেছে নিচ্ছেন। যে আলো আজ রাতে ঘরকে সুন্দর করে তুলবে, আর যে আগুন আগামিকাল তাঁর পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেবে।
বহু মানুষের পরিশ্রমে তৈরি হত দীপাবলির উৎসব-
সময়টা ১৯২৬ সাল। তখনও ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারত। বহু পরিবারের কাছে দীপাবলির প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত উৎসবের কয়েক দিন আগে থেকেই। নিজেদের হাতে মাটির দেওয়াল মেরামত করা হত। ছাই ও তেঁতুল দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করা হত পিতলের বাসনপত্র। কাঠের উনুনে তৈরি হত নানা ধরনের মিষ্টি।
শিশুরা নতুন পোশাকের জন্য অপেক্ষা করত। অনেকের কাছে সেটিই ছিল বছরের একমাত্র নতুন পোশাক। মহিলারা আঙুলের সাহায্যে তুলো পাকিয়ে তৈরি করতেন প্রদীপের সলতে। গ্রামের কুমোর শত শত মাটির প্রদীপ তৈরি করতেন। অনেক সময় টাকার পরিবর্তে শস্যের বিনিময়ে সেই প্রদীপ বিক্রি করতেন তাঁরা। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি উৎসব মনে হলেও, আসলে এর পিছনে ছিল বহু মানুষের পরিশ্রম। প্রত্যেকেই এমন কিছু দিতেন, যা অন্যদের প্রয়োজন মেটাত।
একবার কল্পনা করুন, কুমোর তাঁর চাকার পাশে বসে রয়েছেন। দুই হাত ভেজা মাটিতে মাখামাখি। এমন সময় এক কৃষক এসে কিছু শস্য দিয়ে এক ঝুড়ি প্রদীপ নিয়ে চলে গেলেন। কেউ কাউকে উপহার দেননি। দু’জনেই নিজেদের কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় জিনিস বিনিময় করেছেন। কিন্তু এই ব্যবস্থার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে গভীর মানবিকতা। এক পরিবার শস্য ফলায়, অন্য পরিবার প্রদীপ তৈরি করে। আর এভাবেই সম্মিলিতভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে একটি উৎসব।
আমরা প্রায়ই স্বাধীনতা বলতে বুঝি, অন্য কারও প্রয়োজন না পড়ার ক্ষমতা। কিন্তু জীবনের প্রকৃত আনন্দের অনেকটাই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে এই উপলব্ধির মধ্যে যে, বেঁচে থাকার জন্য আমরা একে অপরের উপর কতটা নির্ভরশীল।
একই উৎসব, উদযাপনের নানা রীতি-
সেই একই দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে দীপাবলি উদযাপনের রীতিও ছিল আলাদা। দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে পরিবারগুলি সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠে তেল মাখত, স্নান করত এবং নতুন পোশাক পরে সকালেই উৎসব পালন করত। বাংলায় অমাবস্যার রাতে হত মা কালীর আরাধনা। গুজরাতের পরিবারগুলি দীপাবলির পরের দিন নতুন বছরকে স্বাগত জানাত। ব্যবসায়ীরা নতুন খাতার পাতা খুলতেন, নতুন বছরের সমৃদ্ধির আশায় শুরু করতেন হিসাবনিকাশ।
অন্যদিকে, ধনী পরিবারগুলির বাড়ি যেখানে বৈদ্যুতিক আলোয় ঝলমল করত, সেখানে গ্রামের বহু বাড়িতে আলোর একমাত্র ভরসা ছিল কয়েকটি তেলের প্রদীপ। উৎসব সবার হলেও, সবার পরিস্থিতি একরকম ছিল না।
কোনও আলোকোজ্জ্বল প্রাসাদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শিশু হয়তো হাজার হাজার বৈদ্যুতিক আলো দেখে বিস্মিত হত। আবার দূরের কোনও গ্রামের আরেকটি শিশু হয়তো একটি মাটির প্রদীপকেই পরম আনন্দে আগলে রাখত। কেউই নিজের জন্মপরিস্থিতি বেছে নেয়নি। একজনের জীবনে ছিল প্রাচুর্য, অন্যজনের জীবনে সীমাবদ্ধতা। কিন্তু দু’জনেই আলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
এখান থেকেই হয়তো একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম হয়। অন্য কারও উৎসব কতটা বড়, তা দেখেই কি আমরা তাঁর আনন্দের পরিমাণ বিচার করি? আর অন্যের প্রাপ্তির দিকে তাকাতে গিয়ে নিজেদের জীবনে যা রয়েছে, তা কতবার ভুলে যাই?
১১টি প্রদীপের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অর্থ-
ঠাকুমার জ্বালানো ১১টি প্রদীপ আরও একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। তিনি কি সুখী ছিলেন? আমরা তা জানি না। শুধুমাত্র মানুষ দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে ছিলেন বলে সেই দারিদ্রকে কখনও সুন্দর করে দেখানো উচিত নয়। খাবার, অর্থ কিংবা নিরাপত্তার অভাব কোনও আধ্যাত্মিক কৃতিত্ব নয়।
তেলের হিসেব করে ব্যবহার করা কোনওভাবেই এই শিক্ষা দেয় না যে অভাব ভালো। বরং সীমিত সম্পদের মধ্যে মানুষকে কত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেটাই প্রমাণ করে। কিন্তু সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ছিল ভালোবাসা। ঠাকুমা চাইতেন, তাঁর পরিবার উৎসব পালন করুক। আবার পরের দিন সকালে যাতে তাঁদের খাবারের অভাব না হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে চাইতেন তিনি। তাঁর হাত তেলের পরিমাণ মাপছিল। কিন্তু তাঁর মন একসঙ্গে ধরে রেখেছিল আজকের দিন এবং আগামিকালের চিন্তা।
যে পরিশ্রম এখন আর আমাদের চোখে পড়ে না-
এবার নিজেদের বাড়ির কথা ভাবুন। এখন একটি সুইচ টিপলেই গোটা ঘর আলোয় ভরে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দোকান থেকে মিষ্টি কেনা যায়। সারা বছরই পাওয়া যায় নানা ধরনের পোশাক। এই পরিবর্তন মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। এর জন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
কিন্তু সুবিধার এই জীবনযাত্রা নিঃশব্দে পরিশ্রমের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও বদলে দিয়েছে। কোনও জিনিস তৈরি হওয়ার পর আমরা সেটি দেখতে পাই, কিন্তু তার পিছনে থাকা মানুষটিকে প্রায়ই দেখতে পাই না। বাক্সবন্দি অবস্থায় আমাদের কাছে পৌঁছে যায় প্রদীপ। দরজায় খাবার পৌঁছে যায়। পার্সেলে চলে আসে পোশাক।
অথচ কোথাও না কোথাও কেউ এখনও মাটি দিয়ে প্রদীপ তৈরি করছেন, শস্য ফলাচ্ছেন, খাবার রান্না করছেন কিংবা কাপড় সেলাই করছেন। সেই পরিশ্রম হারিয়ে যায়নি। বরং তার একটা বড় অংশ আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছে।
পুরনো দিনের উৎসবের স্মৃতি আজও আমাদের আবেগপ্রবণ করে কেন?
হয়তো এই কারণেই পুরনো দিনের উৎসবের স্মৃতি আজও আমাদের এতটা আবেগপ্রবণ করে তোলে। তার মানে এই নয় যে আমরা আবার অভাবের দিনগুলিতে ফিরে যেতে চাই, কিংবা বিদ্যুৎহীন পৃথিবীকে ফিরে পেতে চাই। বরং আমরা হয়তো সেই অনুভূতিটাকেই ফিরে পেতে চাই, যেখানে প্রতিটি ছোট জিনিসের আলাদা গুরুত্ব ছিল। নতুন করে পরিষ্কার করা একটি বাড়ি, প্রিয়জনের হাতে তৈরি একটি মিষ্টি কিংবা দরজার সামনে যত্ন করে রাখা একটি প্রদীপ।
তবে স্মৃতিরও একটা দুর্বলতা রয়েছে। ক্লান্তির তুলনায় উষ্ণতার স্মৃতি সে বেশি মনে রাখে। যে ঠাকুমা নিজের পরিশ্রমে উৎসবকে সুন্দর করে তুলেছিলেন, তাঁকেও হয়তো দিনের পর দিন বিশ্রামহীনভাবে কাজ করতে হয়েছিল। তাঁকে সত্যিকারের সম্মান জানাতে হলে তাঁর ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর পরিশ্রমের কথাও মনে রাখতে হবে।
আগামী উৎসবে ছোট্ট একটি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন-
পরবর্তী উৎসবে আমরা একটি ছোট্ট পরীক্ষা করে দেখতে পারি। আলো জ্বালানোর সুইচ টেপার আগে কিংবা মিষ্টির বাক্স খোলার আগে একবার ভাবুন, এমন তিনজন মানুষের কথা, যাঁদের পরিশ্রমের ফলে এই মুহূর্তটি সম্ভব হয়েছে।
তাঁদের মধ্যে একজন হয়তো আমাদের পাশেই বসে রয়েছেন। অন্য কেউ হয়তো থাকেন অনেক দূরে। আবার তৃতীয়জন হয়তো আজ আর বেঁচে নেই।
কৃতজ্ঞতা জানাতে আমাদের কোনও বড় বক্তৃতা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। হয়তো তাঁদের কথা মনে করা, কাউকে ধন্যবাদ জানানো কিংবা নিজেদের প্রাপ্তির সামান্য অংশ অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই যথেষ্ট। এর মাধ্যমেই উৎসবকে নতুনভাবে দেখতে শেখা যায়।
এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে আলোর বার্তা-
সেই কল্পিত ঠাকুমার ১১টি প্রদীপের সামনে বসে থাকার ঘটনার পর কেটে গিয়েছে ১০০ বছর। এই দৃশ্য সেই সময়ের নানা রীতি ও কঠিন বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে কল্পনা করা হয়েছে। আমরা জানি না, ওই মহিলার নাম কী ছিল। এমন কোনও কথোপকথন সত্যিই ঘটেছিল কি না, তাও অজানা। কিন্তু তাঁর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল অগণিত পরিবারকে।
আজ যখন আমরা একটি প্রদীপ জ্বালাই, তখন হয়তো আমাদের হাতেও পৌঁছে যায় আগের প্রজন্মের মানুষের রেখে যাওয়া কিছু উত্তরাধিকার। তাঁদের পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং এই আশা যে, পরবর্তী প্রজন্মকে যেন আর এতটা কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে না হয়।
প্রতিটি প্রজন্মের সঙ্গে যদি আমাদের ঘর আরও আলোকিত হয়ে ওঠে, তাহলে সেই আলোকে সম্ভব করে তোলা মানুষগুলিকে আরও স্পষ্টভাবে চিনতে শিখেছি কি আমরা? তাঁদের জীবন, পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মূল্য কি সত্যিই বুঝতে পেরেছি?
