
নয়াদিল্লি ও কলকাতা: কালীঘাট তৃণমূলের অন্দরে ডামাডোল যেন শেষ হতে চাইছে না। যখন একের পর এক সাংসদ-বিধায়ক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছেড়ে চলে গিয়েছেন, তখন বিস্ফোরক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দিদির পাশে আছেন জানিয়েও গতকাল একুশে জুলাইয়ের মঞ্চের ঘটনা নিয়ে সরব হলেন। শ্রীরামপুরের সাংসদ বললেন, তিনি দিদিকে ভালোবাসেন, কিন্তু তৃণমূল নেত্রীকেও বুঝতে হবে। না হলে দল শেষ হয়ে যাবে।
ঘটনার সূত্রপাত গতকাল কলকাতার বিড়লা তারামণ্ডলে কালীঘাট তৃণমূলের একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে কল্যাণের বক্তব্য রাখাকে কেন্দ্র করে। কল্যাণ অতিরিক্ত সময় বক্তব্য রাখছেন বলে উষ্মা প্রকাশ করতে দেখা যায় মমতাকে। শ্রীরামপুরের সাংসদও মঞ্চে কিছু বলেন মমতাকে। তারপর তিনি মঞ্চ থেকে নেমে যান। সেইসময় কল্যাণ দাবি করেন, কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একুশের জুলাইয়ের মঞ্চে তাঁর সঙ্গে মমতার বাদানুবাদের খবর সামনে আসার পরই এদিন সকালে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করেন কল্যাণ।
কী বললেন কল্যাণ?
সাংবাদিক বৈঠকে গতকালের ঘটনা নিয়ে রীতিমতো তৃণমূল নেত্রী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ক্ষোভ উগরে দিলেন কল্যাণ। বললেন, “আমি কথাটা কাউকে বলতে চাইছিলাম না। আমি গতকাল যখন ঢুকি, তখন দোলার (দোলা সেন) উপর সবাই বিরক্ত ছিল। কর্মীরা এসে আমার কাছে বলছিল। আমি গিয়ে সবাইকে ঠিকঠাক করি। ভিড়ও নিয়ন্ত্রণ করি।”
গতকাল বক্তার তালিকার কথা উল্লেখ করে কল্যাণ বলেন, “আমি কুণালকে জিজ্ঞেস করি, কে কে বলবে? উপাসনা আর প্রিয়াঙ্কা রয়েছে। সৌগতদা বলবেন। কিন্তু ওরা তখনও পৌঁছয়নি। আমি বলি, মহুয়াকে বলতে দিতে। কুণাল বলে, লিস্টে মহুয়ার নাম নেই। অনুমতি নিয়ে তবে বলতে দেবে। তখন আমি বলি আমাকে বলতে দিতে। দিদিতে মেসেজ করি।”
তারপরই তিনি বলতে শুরু করেন জানিয়ে শ্রীরামপুরের সাংসদ বলেন, “আমি বলতে শুরু করি, অভিষেক এসে স্টেজে ঘুরতে থাকে। এরকম করতে নেই নিজের জনপ্রিয়তা দেখানোর জন্য। তখন বক্তৃতা বন্ধ রাখি ৫-৭ মিনিট। তারপর দিদি আসলেও আরও ৫ মিনিট বন্ধ রাখি। তারপর দিদির অনুমতি নিয়েই আবার বলি। কথা শেষ করতে দিদি অত্যন্ত অপমানজনকভাব বলেন, ১ ঘণ্টা বক্তৃতা করছি। এভাবে সর্বসমক্ষে ভালো লাগে না দিনের পর দিন।”
অভিষেককে নিশানা করে কল্যাণ বলেন, “অভিষেক এত বড় নেতা, তাহলে দু’মাস আড়াই মাস ঘুরল না কেন? আমি তো ঘুরেছি ঝুঁকি নিয়ে। কর্মীদের সাহস জুগিয়েছি। দিদির এত ঘনঘন বিরক্ত হলে হবে না। দিদির যদি মনে হয় অভিষেক এসেছে, ওকে কেন বসে থাকতে হবে, তাহলে অভিষেককে নিয়ে থাকুন। আমাদের ছেড়ে দিক। কোনও রক্তের সম্মান নিয়ে দিদি নেত্রী হননি। দিদিকে ভালোবাসি বলেই রাজনীতি করেছি। আজ তো আমি ছেড়ে দিয়ে বসে যেতে পারি। কী যায় আসে? আমার জীবন, যৌবন, প্রফেশন, সংসার সব দিদির জন্য স্যাক্রিফাইজ করেছি। উনি যদি অভিষেক অভিষেক করেন, তাহলে তো আমাদের সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। বিজেপির বিরুদ্ধে আমি দলে থেকে লড়াই করব। আমি ওই ৮০ জন আর কুড়ি জনের মতো নই। দিদিকে বুঝতে হবে, নাহলে দল শেষ হয়ে যাবে।”
আরজি কর কাণ্ডের সময় মমতাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে একজন সরাতে চেয়েছিলেন বলে বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন কল্যাণ। তবে কে সরাতে চেয়েছিলেন, সেই নাম নিলেন না। বললেন, “নেত্রীর সুখের সময় আমি দূরে আর দুঃখের সময় কাছে। সুখের সময় সুদীপ, চন্দ্রিমা, ববি করেন। আরজি করের সময় দিদিকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে সরাতে চেয়েছিল। এটা সত্য। আমি আর কুণাল তখন পাশে ছিলাম। কেউ কেউ আমাকে পছন্দ করে না, সেটা সত্যি। কিন্তু বাইরে সবাই আমাকে পছন্দ করে। আমি দিদিকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু দিদিকে রিজনেবল (যুক্তিসঙ্গত) হতে হবে। দিদি যদি মনে করেন, যখন যেটা বলবেন সেটা হবে না। যদি মনে করেন, অভিষেক, ডেরেক যা বলবে, সেটা হবে। তাহলে হবে না। দিদি যদি মনে করেন, জনসমক্ষে বিরক্তি দেখাতে পারি, তা হবে না। যে লড়াই করে তাকে স্বীকৃতি দিতে হয়।”
কাকলির প্রশংসা কল্যাণের-
NCPI-তে যোগ দেওয়া বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের প্রশংসা করে এদিন কল্যাণ বলেন, “২০২২ সালে আমি তো অভিষেকের বিরুদ্ধে বলেছিলাম। তখন এই ৮০ জন কোথায় ছিল? তখন তো তারা অভিষেককে তেল দিয়েছিল। আর ২০ কুড়ি জন। একমাত্র কাকলি (কাকলি ঘোষ দস্তিদার) ছাড়া। সুখেন্দুশেখর রায়রা পরিকল্পনা করেছিল, চিফ হুইপ থেকে একে সরাতে হবে। এটাও সত্য, কাকলি সেদিন আমার পাশে ছিল।”
অভিষেককে নিশানা করে কল্যাণ বলেন, “শুধু কালীঘাট আর ঘরে বসে থাকলে হবে না। বাইরে বেরতে হবে। হরিণঘাটায় আমি একা বিজেপির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলাম। দিদিকে একটু বেরোতে বলেছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইটা করব। দলে থেকে করব। কিন্তু, দিদিকে বুঝতে হবে। দিদি যদি বাস্তব না বোঝেন, তাহলে দিদি যে দল তৈরি করেছেন, সেই দল নিজের হাতেই শেষ করবেন।”
কী বলছে কালীঘাট তৃণমূল?
এদিন কল্যাণের একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য নিয়ে কালীঘাট তৃণমূলের নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় বলেন, “তৃণমূল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাতেই তৃণমূল করি। এর বেশি কিছু বলব না।”