
নয়াদিল্লি: গত দু’টি লেখায় আমরা এমন দু’জনকে বাদ দিয়েছি, যাঁদের হয়তো আপনার এলাকার রাস্তার সমস্যার জন্য দায়ী ভাবছিলেন। তিনি আপনার সাংসদ নন। বিধায়কও নন। তাহলে কে?
পরিচয় করিয়ে দিই আপনার কাউন্সিলরের সঙ্গে। অনেক জায়গায় যাঁকে কর্পোরেটর-ও বলা হয়।
আপনার শহর একটিমাত্র প্রশাসনিক এলাকা নয়। শহরকে একাধিক ওয়ার্ডে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডে সাধারণত প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ থাকেন এবং প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। শহর প্রশাসনে এটাই সবচেয়ে ছোট ও স্থানীয় স্তরের নির্বাচিত পদ। মেয়রের এলাকা যেমন বড়, বিধায়ক বা সাংসদের নির্বাচনী এলাকাও তেমন বড়। তার তুলনায় কাউন্সিলরের এলাকা অনেক ছোট। তাই আপনার নির্দিষ্ট রাস্তার সমস্যাটা কার সবচেয়ে ভালোভাবে জানার কথা—এই প্রশ্নের উত্তর হল কাউন্সিলর।
আপনার কাউন্সিলর আসলে কী করেন?
কাউন্সিলরের মূল কাজ হল নিজের এলাকার মানুষের সমস্যাগুলিকে যতটা সম্ভব জোরালোভাবে তুলে ধরা। আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে না, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার আলো জ্বলছে না, বর্ষায় নর্দমা উপচে পড়ছে—এই ধরনের সমস্যাগুলি সরাসরি পৌরসভার সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কাছে তুলে ধরার কথা কাউন্সিলরের।
কাউন্সিলরদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁরা নিজেদের মধ্যে ভোট দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করেন। আগের একটি লেখায় আমরা দেখেছিলাম, ভারতের অধিকাংশ শহরে মেয়রের ভূমিকা মূলত আনুষ্ঠানিক। আর সেই মেয়রকে ওই চেয়ারে বসানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে কাউন্সিলরদের।
ওয়ার্ড কমিটি কী? কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বড় শহরগুলিতে আরও একটি স্তর রয়েছে। ১৯৯২ সালের সাংবিধানিক সংশোধনের পর তিন লক্ষের বেশি জনসংখ্যার শহরে ওয়ার্ড কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। সাধারণত সংশ্লিষ্ট এলাকার কাউন্সিলরই এই কমিটির চেয়ারম্যান হন।
ওয়ার্ড কমিটির উদ্দেশ্য হল নাগরিকদের সঙ্গে পুর প্রশাসনের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা। স্থানীয় সমস্যাগুলি বৃহত্তর আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হারিয়ে যাওয়ার আগে সেগুলি এখানে তুলে ধরা এবং তার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার কথা।
তাহলে সমস্যার সমাধান তো হয়ে গেল! আপনার অভিযোগ জানানোর জন্য কাউন্সিলরই সঠিক ব্যক্তি।
কিন্তু শহর নিয়ে আগের লেখাটির সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে আছে?
মেয়রের মতো কাউন্সিলরও একই সমস্যার মুখোমুখি হন। প্রতিদিনের অধিকাংশ কাজ বাস্তবে যিনি পরিচালনা করেন, তিনি হলেন পৌরসভার মিউনিসিপ্যাল কমিশনার। তাঁকে রাজ্য সরকার নিয়োগ করে এবং তিনি সরাসরি কাউন্সিলরের কাছে জবাবদিহি করেন না।
অর্থাৎ, কাউন্সিলর আপনার আবর্জনার সমস্যা নিয়ে সরব হতে পারেন, ওয়ার্ড কমিটিতে বিষয়টি তুলতে পারেন, চিঠি লিখতে পারেন, বারবার আধিকারিকদের কাছে তদ্বির করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে আধিকারিকের হাতে সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা, তিনি এমন একজনের কাছে রিপোর্ট করেন যিনি কাউন্সিলরের অধীন নন।
কাউন্সিলর, মিউনিসিপ্যাল কমিশনার এবং রাজ্য সরকার: কে কী করেন?
তাহলে আপনার রাস্তার সমস্যার প্রশাসনিক কাঠামোটা একটু পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। কাউন্সিলরের কাজ হল সমস্যাটি চিহ্নিত করা এবং তা তুলে ধরা। কারণ তিনি এলাকার মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি নির্বাচিত প্রতিনিধি।
মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের দফতরের কাজ হল সেই সমস্যার বাস্তব সমাধান করা।
আর তাঁদের দু’জনের পিছনে রয়েছে রাজ্য সরকার, যারা সাধারণত অর্থ এবং বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। ফলে কোনও সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা পরিকাঠামো থাকবে কি না, সেটাও অনেক সময় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।
তিনটি আলাদা স্তর।
এই তিনটির যে কোনও একটি জায়গায় সমন্বয় ভেঙে গেলেই আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, সেটাই হয়—একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি সেই সমস্যা সম্পর্কে জানেন, কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেলেও সমস্যার সমাধান হয় না।
গত পাঁচটি লেখাকে একসঙ্গে দেখলে আসল বিষয়টি এটাই। ভারতীয় গণতন্ত্রে আপনার একজন নয়, একাধিক নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব ভাগ করে নেন—গ্রাম বা ওয়ার্ড, শহর বা জেলা, রাজ্য এবং দেশ।
আপনার নির্দিষ্ট সমস্যার দায়িত্ব কার, সেটা জানা নিছক কোনও প্রশাসনিক খুঁটিনাটি নয়। এটাই ঠিক করে দেয় আপনি ভুল দরজায় অভিযোগ জানাচ্ছেন, নাকি সঠিক জায়গায় পৌঁছচ্ছেন। তাই পরের বার এলাকার কোনও সমস্যা আপনাকে সত্যিই সমস্যায় ফেললে, শুধু সাধারণ অভিযোগ করে থেমে থাকবেন না।
আপনার কাউন্সিলরের নাম খুঁজে বের করুন। আপনার শহরে ওয়ার্ড কমিটির বৈঠক হলে সেখানে যোগ দিন। সরাসরি কাউন্সিলরকে জিজ্ঞাসা করুন, আপনার রাস্তার সমস্যাটি নিয়ে তিনি কী পদক্ষেপ করেছেন এবং পৌরসভার কাছ থেকে কী উত্তর পেয়েছেন।
হয়তো অবাক হবেন, এমন অনেক কাউন্সিলরই রয়েছেন, যাঁরা অপেক্ষা করছেন—কেউ তাঁদের এই প্রশ্নটা করুক।
সূত্র: ভারতের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ২৪৩এস (৭৪তম সংবিধান সংশোধনী আইন, ১৯৯২); Wikipedia, “Municipal Councillor (India)”; Citizen Matters, “BBMP Corporators ‘Support’ Ward Committees in Their Own Way”; Parisar, Ward Committees-এর ভূমিকা ও গঠন সংক্রান্ত তথ্য।