
নয়া দিল্লি: ফের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উজ্জ্বল ভারতের নাম। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের জন্য অস্কার ক্লেইন পদক (Oskar Klein Medal) পেলেন বিশিষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞানী অশোক সেন (Ashoke Sen)। এই প্রথম কোনও ভারতীয় পদার্থবিদের হাতে উঠল এই সম্মান। শুধু ভারত নয়, বাংলার জন্যও সমানভাবে গর্বের। কারণ বাংলার সঙ্গে তাঁর জন্মগত কানেকশন। কলকাতার ছেলে তিনি। এই শহরেই তৈরি হয়েছিল বিজ্ঞানচর্চার পথ।
১৯৮৮ সাল থেকে প্রতি বছর অস্কার ক্লেইন মেডেল দেওয়া হয়। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্স যৌথভাবে এই সম্মান প্রদান করে। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার জগতে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয় অস্কার ক্লেইন পদক। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে বিশেষ পরিচিত অশোক সেন। এর আগে তিনি পেয়েছেন ডিরাক মেডেল এবং মৌলিক পদার্থবিদ্যায় ব্রেকথ্রু প্রাইজ। পদার্থবিদ্যার জগতে এই দুই পুরস্কারই অত্যন্ত সম্মানজনক বলে বিবেচিত। স্ট্রিং থিওরি পদার্থবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র। কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং মহাকর্ষের মধ্যে বিদ্যমান অসংগতিগুলির সমাধান খুঁজতে এই তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা চলছে।
এই পুরস্কারের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন অশোক সেন। তাঁর বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘গ্র্যাভিটি ফ্রম স্ট্রিংস অ্যান্ড স্ট্রিংস ফ্রম গ্র্যাভিটি’ (Gravity from Strings and Strings from Gravity)। এই বক্তৃতার মাধ্যমে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন তিনি।
অশোক সেন ভারতের বিশিষ্ট তাত্ত্বিক পদার্থবিদ। ১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা অনিলকুমার সেন ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। মা গৌরী সেন ছিলেন গৃহবধূ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা অশোকের বিজ্ঞানচর্চার পথ তৈরি হয়েছিল কলকাতাতেই।
কলকাতার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যাপীঠে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর ১৯৭৬ সালে কানপুর আইআইটি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় বিশিষ্ট পদার্থবিদ অমলকুমার রায়চৌধুরীর কাজ ও শিক্ষাদান তাঁকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
অশোক সেনের গবেষণার মূল ক্ষেত্র স্ট্রিং থিওরি। এই তত্ত্বের মাধ্যমে পদার্থের মৌলিক উপাদান এবং প্রকৃতির বিভিন্ন বলকে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামোয় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে তাঁর গবেষণা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান এস-ডুয়ালিটি (S-duality) নিয়ে গবেষণা। এই ধারণা তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় শক্তিশালী ও দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে।
গবেষণার কাজে প্রথম দিকে আমেরিকার ফার্মিল্যাব এবং স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর সেন্টারে কাজ করেন অশোক সেন। ১৯৮৮ সালে তিনি মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে (TIFR) যোগ দেন। ১৯৯৭ সালে প্রয়াগরাজের হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (NISER) এবং আইআইএসইআর ভোপালের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
বর্তমানে বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেস (ICTS)-এ ICTS-ইনফোসিস মাধব চেয়ার প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন অশোক সেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাঁর যোগ রয়েছে।
বিজ্ঞানজগতে অবদানের জন্য দেশ-বিদেশের একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন অশোক সেন। ১৯৮৯ সালে তিনি পান আইসিটিপি পুরস্কার। ১৯৯৪ সালে পান শান্তি স্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার। ১৯৯৭ সালে তাঁকে দেওয়া হয় টিডব্লিউএএস পুরস্কার। ১৯৯৮ সালে বিখ্যাত রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন তিনি।
২০০১ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন অশোক সেন। ২০০৯ সালে পান ইনফোসিস প্রাইজ ইন ম্যাথমেটিক্যাল সায়েন্সেস। ২০১২ সালে মৌলিক পদার্থবিদ্যায় ব্রেকথ্রু প্রাইজ পান তিনি। স্ট্রিং থিওরির বিভিন্ন রূপের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর সন্ধানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি ছিল এই পুরস্কার। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মান দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে পান ডিরাক মেডেল। ২০২৬ সালে অস্কার ক্লেইন পদক তাঁর দীর্ঘ গবেষণাজীবনের সাফল্যের তালিকায় নতুন সংযোজন।