English-Medium Education in India: সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ানোর দিকে কেন ঝুঁকছেন অভিভাবকরা?
Why Parents Choose English-Medium Schools: আজকের 'YOUR INDIA' কলামে সন্তোষ নায়ার বিশ্লেষণ করেছেন, কেন ভারতের লক্ষ লক্ষ অভিভাবক এখনও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলকেই বেছে নিচ্ছেন, এমনকী তাঁদের সন্তানরা শ্রেণিকক্ষে পড়ানো বিষয়বস্তু বুঝতে সমস্যায় পড়লেও। এই লেখায় উঠে এসেছে চাকরি ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব, স্কুলের ইংরেজি মাধ্যম পরিচয়ের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব শিক্ষাদানের ফারাক এবং সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যমে ভর্তি করার আগে অভিভাবকদের কোন বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা উচিত।

একটি ছোট শহরের এক মা তাঁর মেয়েকে স্থানীয় ভাষায় পড়ানো একটি সরকারি স্কুল থেকে ছাড়িয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো একটি বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করালেন। অথচ মেয়েটি তখনও সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারে না। এমনকী বাড়ির কেউই সেই ভাষায় স্বচ্ছন্দ নন। প্রথম বছর মেয়েটির ক্লাসের পড়া বুঝতে যথেষ্ট সমস্যা হয়। মা বিষয়টি জানেন। তবুও তিনি স্কুল বদলের সিদ্ধান্ত নেন।
ভারতের লক্ষ লক্ষ পরিবারের মধ্যে বারবার এমন সিদ্ধান্ত দেখা যায়। একে নিছক বিভ্রান্তি বা সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর অন্ধ চেষ্টা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এর পিছনে রয়েছে শিক্ষাসংক্রান্ত গবেষণায় উঠে আসা দুটি পরস্পরবিরোধী বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা। একদিকে, শিশুরা যে ভাষা আগে থেকেই বোঝে, সেই ভাষায় প্রাথমিক ধারণাগুলি সবচেয়ে ভালোভাবে শিখতে পারে। অন্যদিকে, ভারতে উচ্চশিক্ষা, বেসরকারি ক্ষেত্রে চাকরি এবং আর্থিক উন্নতির দরজা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে খুলে দেয় ইংরেজি ভাষাই।
কেন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দিকে ঝুঁকছেন অভিভাবকরা?
পরিসংখ্যানেই এই প্রবণতার স্পষ্ট ছবি ধরা পড়ে। ২০১৪-১৫ সালে সারা দেশে সরকারি স্কুলে পড়ুয়াদের ভর্তির হার ছিল প্রায় ৫৬.৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ শতাংশে। অর্থাৎ, এক দশকেরও কম সময়ে বেসরকারি স্কুলের দিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ঝুঁকেছেন অভিভাবকরা। আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে পরিবারগুলি বেসরকারি স্কুল বেছে নেয়, তাদের মধ্যে ১৬ শতাংশের কাছে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনাই ছিল সেই সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। অন্যদিকে, সরকারি স্কুল পছন্দ করা পরিবারগুলির ক্ষেত্রে এই কারণের উল্লেখ করেছেন মাত্র ১ শতাংশ। অর্থাৎ, এই পরিবারগুলির একটি বড় অংশের কাছে স্কুল বদলের সিদ্ধান্তের পিছনে ভাষাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
কিন্তু এখানেই বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ, ইংরেজি মাধ্যম বলে প্রচার করা বহু স্কুল বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে সেভাবে ইংরেজিতে পড়াশোনা করায় না। আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশনের ওই গবেষণাতেই দেখা গিয়েছে, ৫২ শতাংশ স্কুল নিজেদের ইংরেজি মাধ্যম বলে দাবি করলেও বাস্তবে মাত্র ২৫ শতাংশ স্কুলে সত্যিকারের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা হয়।
অর্থাৎ, যে পরিচয়ের জন্য অভিভাবকরা টাকা খরচ করছেন, স্কুলে গিয়ে তাঁদের সন্তানরা আদৌ সেই পরিবেশ পাচ্ছে কি না, তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আর স্কুল বেছে নেওয়ার সময় অধিকাংশ পরিবারের কাছেই বিষয়টি অজানা থেকে যায়।
ইংরেজি মাধ্যমের তকমা মানেই ইংরেজি শেখা নয়-
পড়াশোনার ফলাফলেও এই ফারাক স্পষ্ট। ASER-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ভারতের পঞ্চম শ্রেণির মাত্র চারজন পড়ুয়ার মধ্যে একজন একটি সাধারণ ইংরেজি বাক্য পড়তে পারে। অষ্টম শ্রেণিতেও এই দক্ষতা অর্জন করতে পারে মাত্র দু’জনের মধ্যে একজন।
অর্থাৎ, বহু শিশুকেই এমন একটি ভাষায় পড়ানো হচ্ছে, যে ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মতো উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশই তাদের স্কুল তৈরি করে দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ভাষায় স্পষ্টভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ না পাওয়ার তুলনায় এই পরিস্থিতি আরও খারাপ ফল তৈরি করছে। ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে (NEP) এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেখানে সুপারিশ করা হয়, অন্তত পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং সম্ভব হলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের মাতৃভাষা অথবা পরিচিত আঞ্চলিক ভাষায় পড়াশোনা করানো উচিত।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শিক্ষামূলক গবেষণার ভিত্তিতেই এই সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শিশুরা যে ভাষায় চিন্তাভাবনা করে, সেই ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পেলে পড়ার বোধশক্তি, গণিতের যুক্তি এবং অন্যান্য মৌলিক ধারণা অনেক বেশি স্থায়ী হয়।
তবে এই নীতি ইংরেজি ভাষার বিরোধিতা করে না। বরং এর বক্তব্য, ইংরেজিকে ভালোভাবে একটি বিষয় হিসেবে শেখানো উচিত। কিন্তু শিশু সেই ভাষায় দক্ষতা অর্জনের আগেই অন্য সব বিষয় শেখানোর একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ইংরেজিকে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
তবুও ইংরেজিকেই কেন নিরাপদ ভবিষ্যতের চাবিকাঠি মনে করেন অভিভাবকরা?
সমস্যা হল, জাতীয় শিক্ষানীতির এই সুপারিশের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ অভিভাবকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সংঘাত রয়েছে। ভারতের চাকরির বাজারের দিকে তাকিয়ে অনেক অভিভাবকই মনে করেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলই সবচেয়ে ভালো বিকল্প। কারণ, ভারতে উচ্চশিক্ষা, অধিকাংশ বেসরকারি সংস্থায় নিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে ইংরেজির গুরুত্ব যথেষ্ট বেশি।
তাই কোনও অভিভাবক যখন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বেছে নেন, তখন তিনি সব সময় সামাজিক মর্যাদা বা আধুনিকতার পিছনে ছোটেন না। অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক উন্নতির কথা ভেবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে যে পরিবারগুলি চায়, তাদের সন্তানই পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে কোনও ভালো অফিসে বা পেশাদার ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ পাক, তাদের কাছে ইংরেজি মাধ্যমের আকর্ষণ আরও বেশি।
শুরুতে যে ছোট শহরের মেয়েটির কথা বলা হয়েছিল, তার পরিস্থিতির কথাই ভাবুন। নতুন স্কুলে যদি সত্যিই ইংরেজিতে পড়ানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সে ভাষাটিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। সেই দক্ষতা ভবিষ্যতে তাকে অন্যদের তুলনায় এগিয়ে রাখবে।
কিন্তু তার স্কুল যদি সেই অধিকাংশ স্কুলের মধ্যে পড়ে, যারা শুধু ইংরেজি মাধ্যমের তকমা ব্যবহার করে, অথচ বাস্তবে সেভাবে পড়াশোনা করায় না, তাহলে মেয়েটি দু’দিক থেকেই বঞ্চিত হতে পারে। একদিকে, যে ভাষা সে ভালোভাবে বোঝে না, তাতে পড়াশোনা করার কারণে তার প্রাথমিক শিক্ষার ভিত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যে ইংরেজি শেখার আশায় তার মা স্কুল বদলেছিলেন, সেই দক্ষতাও হয়তো তার অর্জন হবে না।
স্কুল বদলের আগে অভিভাবকদের কী প্রশ্ন করা উচিত?
আজ যে পরিবারগুলি সন্তানকে স্থানীয় ভাষার স্কুল থেকে ইংরেজি মাধ্যমে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে, তাদের প্রথমেই একটি প্রশ্ন করা উচিত। স্কুলটি শুধুই ইংরেজি মাধ্যম বলে দাবি করছে, নাকি সত্যিই ইংরেজিতে পড়ানোর উপযুক্ত পরিকাঠামো ও ব্যবস্থা রয়েছে?
শুধু ‘ইংরেজি মাধ্যম’ কি না, এই প্রশ্ন করলেই চলবে না। কারণ, পরিসংখ্যান বলছে, স্কুলের এই পরিচয়ের সঙ্গে বাস্তব শিক্ষাদানের বিস্তর ফারাক থাকতে পারে।
বরং আরও নির্দিষ্টভাবে জানতে হবে, স্কুলে ঠিক কীভাবে ইংরেজি শেখানো হয়? কোন শ্রেণিতে পৌঁছনোর পর পড়ুয়ারা সাবলীলভাবে ইংরেজি পড়তে ও বলতে পারে? স্কুল কর্তৃপক্ষ কি শুধুই মুখের কথায় এই দাবি করছে, নাকি পড়ুয়াদের দক্ষতার প্রমাণও দেখাতে পারবে?
সন্তানের স্কুল বদলের আগে অভিভাবকদের এই প্রশ্নগুলির উত্তর জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশন—বেসরকারি স্কুলে পড়ুয়া ভর্তির প্রবণতা ও ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের বাস্তবতা সংক্রান্ত গবেষণা; অ্যানুয়াল স্টেটাস অব এডুকেশন রিপোর্ট (ASER)—পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়াদের ইংরেজি পড়ার দক্ষতা সংক্রান্ত তথ্য; জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০—ভারত সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের ভাষাভিত্তিক শিক্ষাদানের সুপারিশ।
