
কলকাতা: অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ সংক্রান্ত মামলায় বড় স্বস্তি কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের (TMC)। তৃণমূল বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতে ৪৪০ কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করেছিল পুলিশ। সেই অ্যাকাউন্টের টাকা ব্যবহার করার আর্জি জানিয়ে কলকাতৃা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল। বৃহস্পতিবার সেই মামলায় মিলল স্বস্তি। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের নির্দেশে আপাতত ওই সব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবে তৃণমূল। তবে একজন স্পেশাল অফিসার নিযুক্ত করা হয়েছে। কেন এত দ্রুত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হল? কী এমন প্রমাণ মিলেছে? ভোটের আগে কেন অভিযোগ জানানো হল না? প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতি।
একজন বিশেষ অফিসার নিয়োগ করেছে হাইকোর্ট। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে এই অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিযুক্ত থাকবেন তিনি। যে কোনও দু’জন, যাঁদের সই করার ক্ষেত্রে অনুমোদন আছে, তাঁরাই ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিদিনের খরচপত্র জানানো হবে তাঁকে। কাউন্টার সইও করবেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদার।
বিচারপতি স্পষ্ট বলেন, “তিনটি ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্ট দেখে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে যে এখনও বিস্তারিত তথ্যের অভাব আছে। আদালত বিশেষ কোনও প্রমাণ খঁজে পায়নি যাতে এই ধরনের পদক্ষেপ করা যায়। তবে এই মামলায় পরে এই সংক্রান্ত তথ্য পেলে, সেটা বিবেচনা করা হবে।”
কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের তরফে আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি বলেন, “কীভাবে এই জয়ী বিধায়করা অভিযোগ করতে পারেন?”
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, “অভিযোগ তো যে কেউ করতে পারে।”
সিংভির সওয়াল, “তাহলে তদন্ত হোক। অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হবে কেন? চেয়ার, ড্রিংক্স (পানীয়)-তে বিশাল টাকা খরচ করা হয়েছে। তারপর এই অভিযোগ!”
বিদ্রোহী তৃণমূল অর্থাৎ ঋতব্রত-শিবিরকে কটাক্ষ করে মনু সিংভি বলেন, “এই প্রথম কোনও বিরোধী দলনেতা শাসক দলকে সমর্থন করছে, গিনেশ বুক অব রেকর্ডে নাম উঠবে।”
এদিকে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরের আইনজীবীর সওয়াল, “আমরাই আসল তৃণমূল। আমরা এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করি। তাই অন্য কেউ কিছু চাইলেই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার হচ্ছে।”
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বক্তব্য, “আপনারা তৃণমূল থেকে লড়ে জিতেছেন। ফ্যাক্ট চেঞ্জ হল, আর তারপর নিজেরাই অভিযোগ করলেন? ৪ মে কেন এই প্রশ্ন তুললেন না? ১৮ জুনের আগে কেন প্রশ্ন তুললেন না?”
বিদ্রোহী তৃণমূলের আইনজীবী কে পরমেশ্বর বলেন, “৪ মে-র তার পর যাবতীয় অভিযোগ হয়েছে। পুলিশ ঠিক করবে না কে তৃণমূল। তাই আমাদের এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে দিন।”
সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, “তদন্তকারীদের পক্ষ থেকে জানা সম্ভব নয়, কে আসল তৃণমূল। কোনও অন্তর্বতী নির্দেশ নির্বাচন কমিশন ছাড়া কেউ রেকমেন্ড করতে পারে না।”
এরপর তুষার মেহতাকে বিচারপতি প্রশ্ন করেন, “অ্যাকাউন্ট কেন ফ্রিজ করা হল?”
তুষার মেহতা বলেন, “সাতজন এমএলএ-র কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। তিনটি স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়েছে।”
বিচারপতির কড়া পর্যবেক্ষণ, “সাতের বদলে ৭০টি পেতে পারেন। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কী এমন প্রমাণ পেলেন, যে কারণে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করলেন?”
বিচারপতির প্রশ্ন, “এত দ্রুততা কেন? সাধারণ একজন মানুষ এলে পুলিশ তো এত সক্রিয় হয় না? কী এমন প্রমাণ, আপনাদের সন্তুষ্ট করল যে আপনারা ফ্রিজ করে দিলেন? ফলাফল উল্টো হলে কী হত?” বিচারপতি বলেন, “রেজাল্ট প্রকাশের পর অভিযোগ করা হচ্ছে। আমার বদভ্যাস আমি আমার মনের কথা বলে ফেলি।”
বিচারপতির বক্তব্য, ‘অ্যাকাউন্টের লেনদেনের সন্দেহ এবং অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অধিকারের মধ্যে একটা ব্যালেন্স করতে হবে। তাই কোর্ট একজন অফিসার নিয়োগ করতে চাইছে, যাতে টাকা সাইফন না হয়ে যায়।’
এজি সুরজিত মিত্র প্রশ্ন করেন, “২১৫ জন কর্মীর বেতন ৫১ লক্ষ টাকা। এর ডকুমেন্টস কোথায়? একটা টাকা ধার্য করা হোক, যেটা প্রতি মাসে দেওয়া হবে।”
এজি বলেন, “কার অ্যাকাউন্ট, তার চাইতে বড় ব্যাপার যে টাকাটা বেআইনি। লেনদেন সন্দেহজনক।”
বিচারপতি সেই আবেদন খারিজ করে বলেন, “এটা তৃণমূলের একাউন্ট। কত টাকা দেবে তারা ঠিক করবে।”
বিচারপতি বলেন, “এখনও পর্যন্ত কোনও প্রমাণ তদন্তকারীরা দেখাতে পারেননি। যাতে সন্তুষ্ট হওয়া যায় একাউন্ট ফ্রিজের মতো পদক্ষেপের।”