
কলকাতা: রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পশুহত্যা নিয়ে বিশেষ নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। গরু, মহিষ, বাছুর হত্যার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সেই ইস্যুতেই একাধিক মামলা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। আজ, বৃহস্পতিবার সেই মামলার শুনানি শেষ হল। রায়দান স্থগিত করা হয়েছে।
অন্যতম মামলাকারীর আইনজীবী দেবযানী সেনগুপ্ত এদিন বলেন, “বকরি ইদে গো-হত্যার উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হোক। একটি পর্যবেক্ষণ কমিটি (monitoring committee) গঠন করা হোক।” তবে কীভাবে শর্তগুলো কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে এদিন একের পর এক প্রশ্ন উঠেছে আদালতে।
আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “প্রতিটি ব্লকে পশু চিকিৎসক (veterinary doctors) নিয়োগ করা হোক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা হোক। রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, উপযুক্ত সার্টিফিকেট ছাড়া গরু, বাছুরের মতো পশু হত্যা করা যাবে না। সেই সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নেই বলে উল্লেখ করেন আইনজীবী। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার এই পরিকাঠামো তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কসাইখানা কোথায় আর পশুচিকিৎসকরাই বা কোথায়?
সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী গরু হত্যা করা যাবে না। আইনজীবী বলেন, “একটি গরুর গড় আয়ু ১৫ বছর। তাহলে এই নিয়মগুলো কীভাবে কার্যকর করা হবে তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।”
আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্য়ায় এই বিজ্ঞপ্তির বৈধতা এবং আইনি ভিত্তি নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, যাঁরা ইতিমধ্যে পশু কিনে ফেলেছেন, তাঁদের এই নিয়মের আওতা থেকে ছাড় দেওয়া উচিত। এই নোটিসের উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, “এই নোটিসটি সংশোধন করা হোক। ১৯৫০ সালের নিয়মে বলা হয়েছে যে গো-হত্যা সীমিত করা উচিত কারণ তারা কৃষিকাজে সাহায্য করে। কিন্তু বর্তমানে কৃষিকাজে গবাদি পশু আর এত বেশি ব্যবহার করা হয় না।”
পশুর বয়স কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? সেই প্রশ্নও তুলেছেন বিকাশরঞ্জন। তিনি বলেন, “যদি কোনও পশুকে জবাই করার জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেট না দেওয়া হয়, তবে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে। পৌরসভা এলাকায় কসাইখানাগুলো কোথায়?
তিনি সওয়াল করেন, সম্পূর্ণ গো-বিক্রির হাটগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস রয়েছে, এটি তাদের একটি ধর্মীয় আচার, যা উপেক্ষা করা যায় না। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, গবাদি পশুর শুমারি অনুযায়ী গবাদি পশুর সংখ্যা ১.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আইনজীবী মেঘনাদ দত্ত বলেন, “বিধিনিষেধগুলো কার্যকর করা হোক। নিয়মকানুন সম্পর্কে বিজ্ঞাপন বা প্রচার করা দরকার। সমস্ত অবৈধ পশুর হাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে পশু জবাইয়ের সঙ্গে ধর্মীয় উপাদানের কোনও সম্পর্ক নেই।”
অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী উল্লেখ করেন, রাজ্য যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তা কলকাতা হাইকোর্টের ২০১৮ সালের একটা নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই। সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চ নির্দেশে জানিয়েছিল যে বকরি ইদে গরু কুরবানি করা কোন অধিকার নয়।
তিনি আরও বলেন, “১৯৫০ সালের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নির্দেশিকা জারি করেছে। সেখানে ১৯৫০ সালের আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি। ফলে এখন প্রশাসন যে নির্দেশ জারি করেছে, তা মানতে বাধ্য সবাই। সামজিক স্বার্থের পাশাপাশি পাচারের কারণে গরু এমনিতেই কমে যাচ্ছে রাজ্যে। এটা শুধু রাজ্যে নয়, গোটা দেশেই একই আইন রয়েছে। রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “এই বিজ্ঞপ্তি হাইকোর্টের একটা নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি।”