
কলকাতা: প্রকৃতি কি তবে চরম প্রতিশোধের পথে? ইউরোপের আবহাওয়া দফতর (ECMWF) থেকে শুরু করে আমেরিকার হাওয়া অফিস NOAA, বার রিপোর্টেই এক ভয়াবহ অশনি সংকেত। ১৮৭৭ সালের পর অর্থাৎ দীর্ঘ ১৪০ বছর পর পৃথিবীতে আসতে চলেছে সবথেকে শক্তিশালী ‘এল নিনো’। যাকে আবহাওয়াবিদদের একাংশ ‘মেগা এল নিনো’ বা ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এরই সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতে? বর্তমান গ্রীষ্মের দাবদাহ বিগত সব রেকর্ড ভাঙার উপক্রম করতেই সেই ইঙ্গিতই যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।
বিশ্বের উষ্ণতম শহরের তালিকায় ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য। সোজা কথায় বর্তমান বিশ্বের আবহাওয়ার পরিসংখ্যানে চরম অস্বস্তিকর ছবি ভারতের। বিশ্বের ২০টি উষ্ণতম শহরের তালিকার মধ্যে ১৯টিই ভারতের। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD) জানিয়েছে, বিহারের ভাগলপুর, ওড়িশার তালচের এবং পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল বর্তমানে বিশ্বের উষ্ণতম স্থানের তালিকায় শীর্ষে। এই প্রতিটি শহরেই তাপমাত্রাই ছুঁয়ে ফেলেছে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি। দিল্লির পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সেখানে পারদ রোজই ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশে ৪২ ডিগ্রিে, নাগপুরেও তাই। অন্যদিকে ভোপাল ও ভুবনেশ্বরে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির ঘরে ঘোরাফেরা করছে। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেও এখন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির নিচে নামছে না।
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের ঠান্ডা জলরাশি যখন অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় ‘এল নিনো’। ট্রিলিয়ন লিটার জল আচমকা গরম হয়ে যাওয়ার ফলে বায়ুমণ্ডলের উপর তার বিরূপ প্রভাব পড়ে, গোটা বিশ্বের আবহাওয়া বদলে যায়। সাধারণত এটি ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এবারের আশঙ্কা আরও বেশি কারণ প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার NOAA-র রিপোর্ট অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এই এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬১ শতাংশ।
সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হল, এই এল নিনো তখনই পূর্ণ শক্তি অর্জন করবে যখন ভারতে বর্ষাকাল। অর্থাৎ মৌসুমি বায়ুর পুরোদমে সক্রিয় থাকার কথা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫-১৬ সালে যখন সুপার এল নিনো এসেছিল, তখন ভারতে বৃষ্টির পরিমাণ ১৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। যার ফলে ভারত ও পাকিস্তানে তীব্র দাবদাহে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এদিকে ভারতের কৃষি ব্যবস্থার ৫০ শতাংশেরও বেশি অংশ সরাসরি বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। এবার যদি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের থেকে কম হয়, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীন অর্থনীতি বড়সড় সঙ্কটের মুখে পড়তে পারে।
১৯০১ সাল থেকে ভারতে আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সাল ছিল উষ্ণতম বছর। সেই বছর দিল্লির সফদরজং ৪৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভয়ঙ্কর তাপমাত্রা দেখা গিয়েছিল এবং রাজস্থানের চুরুতে পারদ পৌঁছেছিল ৫০.৫ ডিগ্রিতে। কেবলমাত্র মে মাসেই তাপপ্রবাহের দিনের সংখ্যা বেড়েছিল ১২৫ শতাংশ। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৪০ বছরের বিরলতম ‘মেগা এল নিনো’র প্রভাবে এবার ২০২৪ সালের সেই রেকর্ডও ভেঙে খান খান হয়ে যেতে পারে।