
সায়ন্ত ভট্টাচার্য: নতুন সরকার গঠনের পরই বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হচ্ছে বেআইনি দোকানপাট-নির্মাণ। এবার এই বুলডোজার নিয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের কলকাতা । হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথী সেনের ডিভিশন বেঞ্চে। দ্রুত শুনানির আবেদন জানানো হয়েছে। এই মামলায় সওয়াল করেছেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর হাতে মামলার একগুচ্ছ কাগজ। এজলাসে তখন তিল ধারণের জায়গা নেই।
এদিন শুনানির শুরুতেই সওয়াল করেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, “যেখানে যেখানে ভাঙচুড় হয়েছে, সেগুলি ঠিক করে দিতে হবে। আগের হাইকোর্টের এই সংক্রান্ত অর্ডার ফলো করতে হবে।”
আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জোর সওয়াল, “তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসে আক্রমণ হয়েছে। ব্রুটালি এসল্ট করা হয়েছে সমর্থকদের। তাঁদের আর্জেন্ট মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট দরকার।” তিনি জানান, খেজুরিতে ৬০ টি দোকান জ্বালানো হয়েছে। ডোমজুড়ে ব্লক প্রেসিডেন্ট আক্রান্ত হয়েছেন বলেও বিচারপতির সামনে উল্লেখ করেন তিনি।
এরপরই আইনজীবী বিকাশরঞ্জন বলেন, “বুলডোজার কালচার এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে। এখানে এই বুলডোজার কালচার ছিল না। হকার জোন যেগুলি চিহ্নিত সেখানেও বুলডোজার চালানো হচ্ছে। দোকান ভাঙা হয়েছে। মূর্তি ভাঙা হয়েছে। মানুষের বেঁচে থাকার এবং জীবনের অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।”
ভোট পরবর্তী হিংসার কথা উল্লেখ করে কল্যাণ বলেন, “আগের বারের থেকেও বেশি ভোট পরবর্তী সংঘর্ষ হচ্ছে। প্রশাসন কোনও নিরাপত্তা দিতে পারছে না।” ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হানাহানির তথ্য দেন কল্যাণ। তাঁর দাবি, ভোট পরবর্তী পর্যায়ে ১০ জন খুন হয়েছেন, ১৫০-১৬০ পার্টি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বহু মানুষ আতঙ্কে বাড়ি ছাড়া হয়ে রয়েছেন বলে জানান। মহিলাদের ওপরেও প্রকাশ্যে হামলা চলছে বলে আদালতে কল্যাণ উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, হগ মার্কেটে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, “আদালতের রায় ছাড়া, আইন না মেনে বুলডোজার অপারেশন চালানো যাবে না। আপাতত এটা অন্তর্বতী নির্দেশ দেওয়ায় হোক রাজ্য সরকারকে।” সুপ্রিম কোর্টের অর্ডারের বক্তব্য উল্লেখ করে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বুলডোজারের নির্দেশের পাল্টা পদক্ষেপ করার দাবি করলেন।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে দেওয়া হোক। এজলাসে তখন কথা হচ্ছিল। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, “কেউ কোন কমেন্ট করবেন না… ডেকোরাম মেন্টেন করুন।”
এরপরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করেন, “এটা পশ্চিমবঙ্গ, এটা উত্তরপ্রদেশ নয় । এখানে বুলডোজার চালানো যায় না।” ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হানাহানিতে জখমের ছবি দেখাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সংখ্যালঘুরা যে আক্রান্ত হচ্ছেন, তা উল্লেখ করেন।
গোটা পরিস্থিতির উল্লেখ করতে থাকেন মমতা। তিনি বলেন, “আমি ১৯৮৫ সালে বারের এনরোল করেছি।” পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করতে থাকেন, “বাচ্চাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়নি। মেয়ে, সংখ্যালঘুদেরও ছাড়া হয়নি। আমি দশ জনের নাম দিচ্ছি, যাঁরা মারা গিয়েছেন।”
মমতা তখন বলেন, “আমরা এখানে আলোচনা করতে চাই না। পুলিশকে নির্দেশ দিন।
পুলিশ FIR নিচ্ছে না। আমার পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। ধর্ষণ, খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।” তিনি আদালতে সওয়াল করেন, “মানুষ আতঙ্কে অফিস যেতে পারছে না। মাছের বাজার, মাংসের বাজার ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।”
বিচারপতি পার্থ সারথী সেন তখন জানতে চান, “এগুলি হলফনামায় উল্লেখ করেছেন?” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “হ্যাঁ করা হয়েছে। পুলিশ যেন FIR নেয়। মানুষকে নিরাপত্তা দেয়।”
এদিন অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী ভার্চুয়ালি সওয়াল করেন। তিনি বলেন, “এই মামলা জনস্বার্থ কীভাবে? একজন আইনজীবী যিনি প্র্যাক্টিস করেন, তিনি মামলা করেছেন।” তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন, “কোনও নির্দেশ দেওয়ার আগে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখুক।” তৃণমূলের তরফে তোলা জনস্বার্থ মামলার এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কলকাতা পুলিশের তরফে আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী আদালতে সওয়াল করেন, ”
মিডিয়াও এত কিছু নিয়ে কভার করেনি, যেখানে এরা এত বেশি সংখ্যায় ভায়োলেন্সের কথা বলছেন। আদৌ পোস্ট পোল ভায়োলেন্স হচ্ছে কি না, সেটা দেখা হোক।
এটা ওয়েল ফেয়ার স্টেট। যদি এত ঘটনা ঘটত মিডিয়া কি দেখাত না?” তিনি বলেন, “পুলিশ কিছু করছে না এটা ঠিক নয়। শুধু মৃতদের ছবি দিয়ে অভিযোগ করলে হবে না। প্রমাণ থাকতে হবে। সব জায়গায় থানা আছে। সেখানে অভিযোগ আসেনি। অনেক ঘটনা হতে পারে। সেগুলি যে ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা সেটা অনুমান হতে পারে।”
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেন, “আমরা বিধানসভা ক্ষেত্র অনুযায়ী সব জায়গার ভাঙচুড় উল্লেখ করেছি। আর কী করব? কিছু অনুমান নয়, ডিটেল দিয়েছি। সব তথ্য দেওয়া আছে, পুলিশ কি ঘুমাচ্ছে ?” তিনি দাবি করেন, “পুলিশ ছিলই না। নিয়োগ করুন একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে। ঘটনার তদন্ত হোক।”
এরপর প্রধান বিচারপতির কাছে হাত জোড় করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলতে থাকেন, “প্লিজ প্লিজ স্যর, প্লিজ ফর্ দ্য পিপল, প্রোটেক্ট দ্য পিপল।” তিনি বলেন, “আমার একটাই শেষ বক্তব্য রাজ্যের মানুষকে নিরাপত্তা দিন।”