
কলকাতা: একদম সহজ, সরল, সাদামাটা মানুষ। চোখে একটা হাই পাওয়ারের চশমা। পোশাকে কোনও আতিসজ্য নেই। বরং প্রতিদিন টি-শার্ট আর ক্যাজুয়াল প্যান্টেই স্বচ্ছন্দ্য তিনি। তাঁকে দেখে বোঝার জো নেই, এই ব্যক্তিন নাম স্টিফেন হকিং ও পিটার হিগসের মতো বিশ্বখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তিনি অশোক সেন (Ashoke Sen)। সম্প্রতিই মৌলিক পদার্থবিদ্যায় গবেষণার জন্য অস্কার ক্লেইন মেডেল (Oskar Klein Medal) পেয়েছেন তিনি।
কলকাতার ছেলে অশোক সেন। আজ তিনি ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র হল তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা এবং স্ট্রিং থিওরি। বর্তমানে তিনি বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্স (International Centre for Theoretical Sciences)-এর সঙ্গে যুক্ত। যতই নাম-যশ পান না কেন, তাঁর প্রভাব নিজের উপরে পড়তে দেননি। রোজ সাইকেল চালিয়ে কাজে যান তিনি।
অশোক সেনের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৫ জুলাই। তাঁর বাবাও পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। তিনি উত্তর কলকাতার শ্য়ামবাজারের কাছে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন। এরপর ১৯৭৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় বিএসসি (B.Sc) ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে আইআইটি কানপুর থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি (M.Sc) করেন।
এরপরে পিএইচডি করার জন্য যখন বিদেশে আবেদন করার সময় আসে, তখন তিনি মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলেন। তার কাছে সুযোগ ছিল না বলে নয়, কারণ ওই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ই পড়ার সামর্থ্য ছিল তাঁর। নিজের মেধার জোরেই স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ পান তিনি। ১৯৮২ সালে পিএইচডি (PhD) অর্জন করেন।
ডক্টরেট শেষ করার পর অশোক সেন ফার্মিল্যাব (Fermilab) এবং স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাক্সেলেটর সেন্টার (Stanford Linear Accelerator Center)-এ পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
স্ট্রিং থিওরিতে গবেষণার জন্য অশোক সেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। স্ট্রিং থিওরি হল এমন একটি তত্ত্ব, যার মাধ্যমে প্রকৃতির মৌলিক কণা ও বলগুলিকে অতি ক্ষুদ্র ‘স্ট্রিং’ বা তারের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়।
এস-ডুয়ালিটি (S-Duality): তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর গবেষণা দেখিয়েছে, কীভাবে শক্তিশালী কাপলিং (coupling) এবং দুর্বল কাপলিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে।
ব্ল্যাক হোল এন্ট্রোপি (Black Hole Entropy): কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বা মাইক্রোস্কোপিক (microscopic) বৈশিষ্ট্য এবং কৃষ্ণগহ্বরের এন্ট্রোপি (entropy) সম্পর্কে জ্ঞান বাড়াতে তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। স্ট্রিং থিওরির গাণিতিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর এই গবেষণা আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য অশোক সেন একাধিক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন।
এছাড়াও ১৯৯৮ সালে তিনি ফেলো অব দ্য রয়্যাল সোস্যাইটি (Fellow of the Royal Society)-তে নির্বাচিত হন।২০২৬ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স (American Academy of Arts and Sciences)-এর ইন্টারন্যাশনাল অনারারি মেম্বার (International Honorary Member) হিসাবে নির্বাচিত হন।