
মাসকয়েক আগেও যিনি বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসতেন, তিনিই আজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। প্রাক্তনের পাড়ায় গিয়ে বিজয় মিছিলও করে এসেছেন তিনি। তবে রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। চাকরি, নারী সুরক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষার খোলনলচে বদলে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছেন তিনি। হাতে পাঁচ বছর সময় থাকলেও, সাতদিনেই কি শুভেন্দু অধিকারী বার্তা দিলেন ‘মর্নিং শো’স দ্যা ডে’?
গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেশের একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সামনে শপথ গ্রহণ করার পর সাতদিন কেটে গিয়েছে। রাজ্যের মসনদে বসেই কী কী করলেন তিনি-
প্রশাসনিক কাজ শুরুর আগেই প্রশাসনিক দফতর বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় বিজেপি সরকার। ব্রিটিশ আমলে তৈরি ঐতিহ্যবাহী রাইটার্স বিল্ডিং-এ রাজপাট সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। সাজিয়ে ফেলা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ঘর। মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের ছেড়ে যাওয়া রাইটার্স নতুন আলোয় সেজে উঠেছে। চলছে সংস্কারের কাজ।
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সরকারি চাকরির উর্ধ্বসীমা ৫ বছর বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে বহু বেকার যুবক-যুবতী চাকরি পাবে।
তৃণমূল আমলে বারবার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ সীমান্তে জমি না দেওয়ায় কাঁটাতার দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকী কেন্দ্র টাকা মিটিয়ে দেওয়ার পরও জমি হস্তান্তর হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। সেই জমি ৪৫ দিনের মধ্যে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুভেন্দু-সরকার।
শুভেন্দুর প্রথম বৈঠকেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ছে, ১ জুন থেকে চালু হবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার। মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে ৩ হাজার টাকা। এছাড়া ১ জুন থেকেই সরকারি মাসে বিনা টিকিটে যাত্রা করতে পারবেন মহিলারা।
চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও একাধিক আধিকারিক দিনের পর দিন চাকরিতে বহাল ছিলেন। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে শুভেন্দু-সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তাঁদের চাকরি জীবন এবার শেষ হচ্ছে। সেরকম অন্তত ৫০০ জনের চাকরি যায়।
স্কুল সার্ভিস কমিশনের ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারানো ‘অযোগ্য’ প্রার্থীদের বেতন ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। পরে সেই রায় বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের পালাবদলের পর নতুন সরকার কাজ শুরু করেই সেই নির্দেশ কার্যকর করেছে। অযোগ্যদের কাছ থেকে বেতন ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে শিক্ষা দফতর।
সব সরকারি স্কুলের প্রার্থনা সঙ্গীতে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বিকাশ ভবনের তরফ থেকে আগেই স্কুলগুলিকে হোয়াট্সঅ্যাপ মারফত নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল। পরে শুভেন্দু নিজে সে কথা ঘোষণা করেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।
প্রকাশ্যে পশু হত্যা বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গরু, মহিষ, বলদ ও বাছুর হত্যার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত মানতে হবে। থাকতে হবে নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট, কসাইখানার বাইরে হত্যা করা যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ধর্মীয় স্থানগুলিতে শব্দের সীমা বেঁধে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। নির্ধারিত মাত্রার বাইরে শব্দ নয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে এই সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনকে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ড আগেও একাধিক ঘটেছে শহরে। তবে অগ্নিকাণ্ডের জেরে বেআইনি নির্মাণের প্রশ্ন সামনে আসতেই যেভাবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুলডোজার চালানো হয়েছে, তা নজিরবিহীন। যে কারখানায় আগুন লেগে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে, সেখানে অগ্নিনির্বাপণের কোনও ব্যবস্থা ছিল না বলে অভিযোগ ওঠে।
ফাইল খোলা হবে, এটাই ছিল বিজেপির প্রতিশ্রুতি। সরকারে এসেই বড় পদক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সপ্তম দিনেই আরজি কর কাণ্ডের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া তিন আইপিএসকে সাসপেন্ড করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্তাকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছে।
শুভেন্দুর নির্দেশে জেলে জেলে অভিযান চলেছে। উদ্ধার হয়েছে একগুচ্ছ মোবাইল। জেলের মধ্যে থেকেই অপরাধ চক্র চলছিল? এই অভিযোগে প্রেসিডেন্সি জেলের সুপার ও চিফ কন্ট্রোলারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
স্কুল ও কলেজগুলিত পরিচালন সমিতির নামে তৃণমূলের ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সাতদিনের মধ্যে সেই সব পরিচালন সমিতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
অনুব্রত মণ্ডলদের জমানায় শিরোনামে উঠে এসেছিল টোলের রমরমা। সরকারি টোল প্লাজা নয়, কার্যত পাড়ায় পাড়ায় টোলের নামে নেওয়া হত টাকা। শুভেন্দু শপথ নেওয়ার দিন চারেকের মধ্যেই সেই সব টোলের ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ওই টোলগুলি বেআইনি।
নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বিপর্যস্ত আলু চাষিরা। পুরনো সরকার ভিনরাজ্যে রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় বড় বিপাকে পড়তে হয়েছিল কৃষকদের। শুভেন্দু ক্ষমতায় এসেই সেই রফতানি চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন।
শুধু ৩৬৬ মিটার যুক্ত করার কাজ বন্ধ থাকায় একটা আস্ত মেট্রো রুট চালু করা যাচ্ছিল না। মমতা-সরকারের আমলে এই নিয়ে রেলের সঙ্গে অনেক সংঘাতও হয়েছে। মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী চেয়ারে বসার পরই মিলেছে ছাড়পত্র। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে শুরু হয়ে গিয়েছে কাজ।
কলেজে কলেজে ভর্তি করার জন্য টাকা নেওয়া হত! বছরের পর বছর এমন সব অভিযোগ সামনে এসেছে। সেই প্রথায় এবার ফুলস্টপ! শুভেন্দু অধিকারী নির্দেশ দিয়েছেন, এবার ভর্তির জন্য আর কলেজে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কেন্দ্রীয় ভাবে পোর্টাল চালু করছে উচ্চশিক্ষা দফতর। সেখান থেকেই অনলাইনে হবে ভর্তি প্রক্রিয়া।
স্বাস্থ্য দফতরের খোলনলচে বদলাতেও উদ্যোগী হয়েছে শুভেন্দু-সরকার। শুক্রবার নিজে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নির্দেশ দিয়েছেন, বেড নেই বলে রোগী ফেরানো যাবে না। অন্য কোনও সরকারি বা কেন্দ্রীয় সরকারি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সব বেসরকারি হাসপাতালকেও একছাতার তলায় আনার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
নিয়ম ছিল আগেই। আইনও ছিল। তবে এবার সেটা সর্বত্র কড়া হাতে কার্যকর করতে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শহর জুড়ে সেই নির্দেশ কার্যকর করতে তৎপর হয়েছে পুলিশ। ধকপাকড় বেড়েছে গত কয়েকদিন ধরেই।