
কলকাতা: বাংলায় প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট। আগামিকাল (সোমবার) বিধানসভায় চলতি আর্থিক বছরের বাকি আট মাসের জন্য পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। অষ্টাদশ বিধানসভার প্রথম বাজেট ঘিরে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ। নতুন সরকারের আর্থিক রূপরেখার ইঙ্গিত মিলতে পারে বাজেটে। প্রথমবার বাজেট পেশের আগে স্বপন দাশগুপ্ত বার্তা দিয়েছেন, “যতটাই করতে পারি, এই বাজেটে করব। আর সামনের দিনে কী করতে চাইছি, সেটা আমরা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করব।”
নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে কী কী চ্যালেঞ্জ?
১৮ জুন থেকে শুরু হয়েছে বাজেট অধিবেশন। বাজেট পেশের আগে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ও নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ির সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বপন দাশগুপ্ত। রাজ্যের বিপুল ঋণের বোঝা ( প্রায় ৮ লক্ষ কোটি) সামলে উন্নয়নের গতি বজায় রাখা নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭.৮ লক্ষ কোটি টাকা। প্রতি বছর ঋণ শোধে খরচ হয় প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৯ হাজার কোটি টাকা সুদ বাবদ। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্যের নিজস্ব রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ লক্ষ ১২ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে রাজস্ব আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। কেন্দ্রীয় করের ভাগ, গ্রান্ট-ইন-এইড ও অন্যান্য উৎস মিলিয়ে রাজ্যের মোট রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকা। মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হয়েছে রাজ্যকে।
শিল্পমহলের নজরও বাজেটের দিকে-
মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের আশা, নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ জোর দেওয়া হবে। উৎপাদন শিল্পের বিদ্যুৎ খরচ কমাতে ঘোষণার প্রত্যাশাও রয়েছে শিল্পমহলের। আগামিকালের বাজেটে শিল্প ও কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া হতে পারে। আসতে পারে নতুন শিল্পনীতি। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। বৃহৎ বিনিয়োগ টানতে রাজ্যের শিল্পনীতিতে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই)-র জন্য পৃথক নীতি প্রণয়নের কাজ চলছে। রাজ্যের প্রায় ৯০ লক্ষ এমএসএমই ইউনিটের জন্য আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে নতুন সরকারের। সোমবারের বাজেটে নতুন শিল্পনীতিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ), জমি, ইনসেনটিভ এবং লজিস্টিক পলিসির উপর জোর দেওয়া হতে পারে। বিজেপির সংকল্পপত্রে ঘোষিত স্টার্ট-আপ নীতির রূপরেখা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্টার্ট-আপ গড়তে যুবকদের সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব থাকতে পারে। পাঁচ লক্ষ যুবককে এই প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্য সরকারের। সিঙ্গুরে নতুন শিল্পতালুক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও বাজেটে উঠে আসতে পারে।
সংকল্পপত্রের প্রতিশ্রুতিগুলির ভিত্তিতেই বাজেটের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে ‘ওয়ান উইন্ডো’ ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় জমির ব্যবস্থা করবে সরকার। পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ও উত্তরবঙ্গের জন্য পৃথক শিল্পনীতি তৈরির ভাবনা চলছে। ইতিমধ্যেই একাধিক শিল্পগোষ্ঠী রাজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে দাবি সরকারের। আদানি ও জিন্দাল গোষ্ঠীর সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সূত্রের খবর। গভীর সমুদ্র বন্দর ও হুগলি নদীর তলদেশে টানেল প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। বাংলা ছেড়ে যাওয়া শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে ফের রাজ্যে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবনাচিন্তাও রয়েছে নতুন সরকারের। এসবের ছাপ পড়তে পারে বাজেটে। ডিএ নিয়ে ঘোষণা হবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা বাড়ছে।
কী বলছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত?
প্রথমবার বাজেট পেশের আগে স্বপন দাশগুপ্ত বলেছেন, “মানুষ অনেক আশা নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছেন। মানুষ একটা বিরাট বড় পরিবর্তন চাইছে। আমাদের ভান্ডারে কতটা টাকা রয়েছে, সেটা ভেবেচিন্তেই পুরো একটা ব্যালেন্স করে করতে হচ্ছে। কিন্তু, একটা দিশা আমরা দেখাব। যতটাই করতে পারি, এই বাজেটে করব। আর সামনের দিনে কী করতে চাইছি, সেটা আমরা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করব।”
বাংলায় বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে দলীয় বিধায়কদের বার্তা দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর, দলীয় বিধায়কদের মমতা বলেছেন, “একটা সরকার সবে এসেছে, তাদের প্রথম বাজেট। আমরা সময় দেব। সবে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সব পদক্ষেপের সমালোচনা করলে মানুষ ভালোভাবে নেবে না। কেন্দ্রের সরকারের কাছ থেকে কী কী রাজ্য সরকার আনতে পারে দেখে নিতে হবে। নজর রাখুন কী হয়। পরে আলোচনার সময় কিছু বলার থাকলে বলার সুযোগ মিলবে।”