
কলকাতা: ভোটের আবহে বঙ্গবাসীকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিজেপিকে জেতানোর আবেদন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এবার কি বাংলায় পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করলেন রাজ্যপাল আরএন রবি? বুধবার লোকভবনে পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ এক অনুষ্ঠানে রাজ্যপালের বার্তা ঘিরেই এই প্রশ্ন উঠেছে। ওই অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল বলেন, “বাংলার গৌরব পুনরুদ্ধারের সংকল্প নিতে হবে।” রাজ্যপাল কেন এই মন্তব্য করলেন, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। আরএন রবিকে কটাক্ষ করতে ছাড়ল না তৃণমূল।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এদিন সকালে কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে সস্ত্রীক পুজো দেন রাজ্যপাল। এরপর লোকভবনে নববর্ষ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল আরএন রবি বলেন, “আজ আমরা পয়লা বৈশাখ উদযাপন করছি। এটি একটি মহান উৎসব। এবং শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের মানুষই নন, বরং বাঙালিরা যেখানেই থাকুন না কেন এবং যাঁরা বাংলার সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা যেখানেই থাকুন না কেন, এই উৎসব উদযাপন করছেন।” অসম-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে উৎসব হচ্ছে, তারও উল্লেখ করেন তিনি।
নিজের বক্তব্য বাংলার ‘অতীত গৌরবের’ কথা উল্লেখ করে রাজ্যপাল বলেন, “স্বাধীনতার সময় এবং পরবর্তী দশকগুলিতে বাংলা ছিল আমাদের সমগ্র দেশের শীর্ষ তিনটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। ১৯৬০-এর দশকে আমাদের জাতীয় জিডিপি-র ১০ শতাংশের বেশি অবদান ছিল বাংলার।” তিনি আরও বলেন, “১৯৮০ সাল পর্যন্ত, আমাদের সমগ্র দেশে মাত্র চারটি রাজ্য ছিল, যাদের মাথাপিছু আয় বাংলার চেয়ে বেশি ছিল। মাত্র চারটি রাজ্য। দুর্ভাগ্যবশত আজ, ১৯৮০ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, এমন ১৫টি রাজ্য রয়েছে যেখানে মানুষের মাথাপিছু আয় বাংলার চেয়ে অনেক বেশি। জাতীয় মূলধনে আমাদের অংশীদারিত্ব ১০.৬ শতাংশ থেকে নেমে মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।”
রাজ্যপাল বলেন, “দেশে ৫.৫ কোটিরও বেশি এমএসএমই থাকলেও বাংলায় মাত্র প্রায় ৩ লক্ষ নিবন্ধিত এমএসএমই রয়েছে। এখন আমরা কোথা থেকে কোন জায়গায় নেমে এসেছি?” বাংলা নববর্ষে এসব কথা উল্লেখ করার কারণ জানিয়ে রাজ্যপাল বলেন, “বন্ধুরা, উৎসবের এই দিনে আমি কেন এসব কথা বলছি? সর্বোপরি, এটি একটি আনন্দের দিন। তবে এটি এমন একটি দিনও, যখন আমরা বলি নববর্ষ, নতুন বছর। নতুন বছরের দিনটিও একটি সংকল্পের দিন। যখন নতুন সূচনা হয়, যখন এটি শুরু হয়, তখন আমরা সবাই, যে যেখানেই থাকি না কেন, আমরা কোথায় আছি তার হিসাব নেওয়ার চেষ্টা করি। তারপর আমরা ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করি, আগামী বছরটি কেমন হতে চলেছে এবং আগামী বছরে আমি কী করতে যাচ্ছি। তাই এটি সংকল্প গ্রহণের দিন। ২০২৬ সালের পয়লা বৈশাখ একটি সংকল্পের দিন। আর আসুন আমরা এই সংকল্প গ্রহণ করি যে, আমরা অবশ্যই আমাদের সেরা অবদান রাখব।”
এরপরই রাজ্যপাল বলেন, “আমরা প্রত্যেকেই, যে যেখানেই থাকি না কেন, জীবন এবং পেশার যে ক্ষেত্রেই যুক্ত থাকি না কেন, আমাদের অবশ্যই বাংলার গৌরব পুনরুদ্ধারের সংকল্প নিতে হবে। আমাদের এখানে বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা আছেন, আপনারা প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও কাজ করে চলেছেন। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, আমি বিশেষ করে বাংলার আমার তরুণ বন্ধুদের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, ইতিবাচক হওয়ার সংকল্প নিন, পরিবর্তনের অংশ হওয়ার সংকল্প নিন। বাংলার গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য এই ইতিবাচক পরিবর্তন স্বর্গ থেকে নেমে আসবে না। এটি আমাদের থেকেই, আমাদের প্রত্যেকের ভেতর থেকেই আসতে হবে।”
সবাইকে আহ্বান জানিয়ে রাজ্যপাল বলেন, “আসুন আমরা এই শপথ নিই যে, যখন দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলা পিছিয়ে থাকতে পারে না। বাংলাকে একটি মর্যাদাপূর্ণ সমান অংশীদার হতে হবে এবং সম্ভবত নেতৃত্ব দিতে হবে। এই যাত্রায় বাংলা পিছিয়ে থাকতে পারে না। বাংলাকে জেগে উঠতে হবে, তার শক্তির ঐতিহ্য ফিরে পেতে হবে, সর্বোপরি এটি মা দুর্গার ভূমি। এবং আমাদের সংকল্প করতে হবে যে আমরা এটি পুনরুদ্ধার করব। আর আমার কোনও সন্দেহ নেই যে বাংলা তার গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের নেতা হওয়ার দিকে ভারতের যাত্রায় একটি শীর্ষস্থানীয় অংশীদার ও পথপ্রদর্শক আলো হয়ে উঠবে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।”
রাজ্যপালের পরিবর্তনের অংশ হওয়ার আহ্বান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁকে কটাক্ষ করে তৃণমূলের রাজ্য সহসভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন, “এই রাজ্যপাল বাংলার সম্পর্কে কিছু জানেন না। আগের রাজ্যপালও কিছু জানতেন না। এই হিন্দিভাষীদের হাত ধরে বাংলা বদলাবে? বাংলার সিনেমা, থিয়েটার দেখুন। বাংলার কবিতা, সাহিত্য জানুন। এই রাজ্যপাল যেখান থেকে আসছেন, সেখানকার একজন কবি, সাহিত্যিকের নাম বলতে পারবেন।”